‘বাজে চুক্তি’: শান্তিচুক্তির রূপরেখা প্রকাশের আগেই ইসরায়েলের তীব্র অসন্তোষ ও বিরোধিতা
জনপ্রিয় হিব্রু দৈনিক 'ইয়েদিওত আহরোনত'-এর রোববার সংখ্যার প্রধান শিরোনাম ইসরায়েলের বর্তমান গণ-মনোভাবকে মাত্র দুটি শব্দে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে তারা আখ্যা দিয়েছে: 'বাজে চুক্তি'।
গত এক বছরে ইরানের বিরুদ্ধে দুটি যুদ্ধ বাধিয়েছে ইসরায়েল। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ হামলাটি চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের এই আলোচনায় ইসরায়েল অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাছাড়া শান্তি চুক্তির উদ্যোগ বারবার বিঘ্নিত হয়েছে লেবাননে ইসরায়েলের হঠকারী আক্রমণে।
এদিকে রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা আসার আগে সংবাদমাধ্যমে যেটুকু তথ্য আসছিল, তাতেই ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। দলমত নির্বিশেষে ইসরায়েলের সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করে।
মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর থেকে অবরোধ তুলে নেবে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হবে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দুই দেশই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।
এসবের কোনোটিই ইসরায়েলের যুদ্ধ বাধানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেনি।
যুদ্ধের শুরুতেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছিলেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য ইসরায়েলের ওপর থেকে 'অস্তিত্বের সংকট দূর করা'। অর্থাৎ ইরানের যেকোনো ধরনের পারমাণবিক ও ব্যলিস্টিন মিসাইল কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। সেইসঙ্গে ইরানের সরকার উৎখাত করা।
এছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি ও গাজার হামাসের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলোকে তেহরাহ্নের সমর্থন চিরতরে বন্ধ করার দাবিও ছিল ইসরায়েলের।
কিন্তু এসব শর্ত এখনও পর্যন্ত চুক্তির খসড়ায় না দেখে ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন।
নেতানিয়াহুর সাবেক ভারপ্রাপ্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাকব নাগেল বলেন, 'শেষ পর্যন্ত যা-ই ঘটুক না কেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একে নিজের একচ্ছত্র বিজয় জাহির করবেন।'
রোববার সাংবাদিকদের সাথে এক ভিডিও ব্রিফিংয়ে নাগেল বলেন, 'ভবিষ্যতে কোন কোন এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হবে, তা মুখে বলা খুব সহজ।' কিন্তু এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা চুক্তির খুঁটিনাটির কোথাও ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধের মতো বিষয়গুলো আলোচনার প্রাথমিক তালিকায় পর্যন্ত রাখা হয়নি বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিরোধীরা অবশ্য এতটা সদয় ছিলেন না; বরং তাদের কণ্ঠে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ঝরেছে।
ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিবিদ অ্যাভিগডোর লিবারম্যান রোববার এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন, 'ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এক চরম বিপর্যয়।'
ইসরায়েলি পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ইয়ার লাপিদ মন্তব্য করেছেন, তিনি আশা করেন ইরানের সাথে এই সম্ভাব্য চুক্তির খবরগুলো যেন কোনোভাবেই সত্য না হয়। এক তিনি বলেন, 'তবে এই গুঞ্জন যদি সত্যি হয়, তাহলে তা হবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির ইতিহাসে অন্যতম বড় ব্যর্থতা।'
অন্যদিকে বর্তমান ইসরায়েল সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এ নিয়ে একপ্রকার মৌনব্রত অবলম্বন করেছেন। স্পষ্টতই ট্রাম্পের রোষানলে পড়ার বা তাকে অসন্তুষ্ট করার প্রচ্ছন্ন ভয় গ্রাস করেছে তাদের।
শুক্রবার এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে নেতানিয়াহু দাবি করেন: 'যতদিন আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আছি, ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না। এই ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও আমি সম্পূর্ণ একমত।' তার বিবৃতিতে ব্যালিস্টিক মিসাইল কিংবা ইরান-সমর্থিত বাহিনীগুলোর নিয়ে কিছু বলা হয়নি।
ইরানের সাথে হওয়া এই চুক্তির রূপরঙ সম্পর্কে অবগত এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতার খাতিরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, এই প্রস্তাবে ইসরায়েলের মূল আপত্তির জায়গাগুলো হচ্ছে:
- ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুতের কী করা হবে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট রূপরেখা নেই। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে লাগাম না টেনে চুক্তিটি যেন ইরানের 'শুভবুদ্ধি' ও 'সদিচ্ছা'র ওপর ছেরেভ দেওয়া হয়েছে।
- এ চুক্তি ইরান সরকারের পতন ত্বরান্বিত না করে উল্টো তাদের রাজকোষে আবার বিপুল অর্থপ্রবাহ এনে দেবে।
- ইরান যাতে তার আঞ্চলিক মিত্রবাহিনীগুলোকে সমর্থন ও দেওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়, তেমন কোনো বাধ্যতামূলক কাঠামোর উল্লেখ নেই চুক্তিতে। অথচ এর অর্থ দাঁড়াবে, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ইতি টানা।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলা কয়েক দিন পর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর রকেট হামলার মধ্য দিয়ে লেবানন সীমান্তে এই নতুন সংঘাতের সূত্রপাত হয়। আর তেহরান প্রথম থেকেই জোর দিয়ে বলে আসছে, যেকোনো বৃহত্তর শান্তি চুক্তিরতে লেবাননকে যুক্ত করতে হবে।
হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র বাহিনী সীমান্তে আছে—এই অজুহাত দিয়ে ইসরায়েল আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল ইরানের সাথে চুক্তিতে যেন লেবাননে হামলাকে যুক্ত করা না হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত দরকষাকষির টেবিলে ওয়াশিংটনের সামনে ইসরায়েলের সেই প্রভাব খাটেনি বলেই মনে হচ্ছে।
অক্টোবরের শেষদিকে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজের জোটের ভেতর থেকে শুরু করে বাইরের কট্টর সমালোচক—সবার পক্ষ থেকেই নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যাতে তিনি ট্রাম্পের কোনো কথা না মানেন। তবে তিনি প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরোধিতা করতে অনিচ্ছুক। কারণ ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রধান পুঁজি হিসেবে প্রচার করে এসেছেন।
