ফিলিপাইনের ভয়াবহ ভূমিকম্পে যেভাবে সমুদ্রের তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে, উপকূলরেখা বেড়ে গেছে কয়েকশো মিটার
গত সপ্তাহে ৭.৮ মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল ফিলিপাইন। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬১ জন, আহত হয়েছে আরও কয়েকশো মানুষ।
গত সপ্তাহের ওই ভূমিকম্প এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা সরাসরি দেশটির উপকূলরেখাকে সম্প্রসারিত করেছে, সেইসঙ্গে সমুদ্রের তলদেশকেও ঠেলে ওপরে তুলে দিয়েছে। সম্প্রতি আকাশপথে চালানো এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
মিন্দানাও দ্বীপের কাছে সারাঙ্গানি প্রদেশ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ছিল এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল। এর তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, কয়েকশো কিলোমিটার দূরে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপেও সেই কম্পন অনুভূত হয়েছে।
সোমবার ফিলিপাইন ইনস্টিটিউট অভ ভলকানোলজি অ্যান্ড সিসমোলজি জানিয়েছে, মূল ভূকম্পনের পর স্থানীয় সময় সকাল ১১টা পর্যন্ত অন্তত ৬ হাজারের বেশি পরাঘাত (আফটারশক) রেকর্ড করা হয়েছে।
এই ভয়াবহ কম্পনে বহু ভবন ধসে পড়েছে, জারি করা হয়েছিল সুনামি সতর্কতাও। এর জেরে প্রায় ২০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় দুই মিটার উঁচু এক ঢেউ আছড়ে পড়ে একটি বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এবং সমুদ্রের নৌকাগুলোকে ভাসিয়ে তীরে নিয়ে আসে।
ভূমিকম্পের পর স্থানীয় বাসিন্দারা এক অদ্ভুত ভূতাত্ত্বিক ঘটনার সাক্ষী হন, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় 'কোস্টাল আপলিফট'। অনেক জায়গায় উপকূলরেখা প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেছে।
ফিভোলকস-এর তথ্যমতে, ভূমিকম্পের সময় ফিলিপাইনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কোটাবাটো খাত সারাঙ্গানি ও দাভাও প্রদেশের উপকূলরেখার একটি বড় অংশকে 'সজোরে ধাক্কা দেয়'। ফলে একসময়ের ডুবন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠ ওপরে উঠে আসে।
ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রের তলদেশ প্রায় ২ মিটার ওপরে উঠে এসেছে।
ফিভোলকস বলেছে, 'প্রাথমিক মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২ মিটার উঁচু হয়েছে, আর উপকূলরেখা প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে।'
বেশ কয়েকটি অঞ্চলে 'আগে ডুবে থাকা প্রবাল এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে গেছে' বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তারা আরও জানায়, সারাঙ্গানির বারাঙ্গে বুরিয়াস ও গ্ল্যান পৌরসভার মাঝামাঝি এলাকায় উপকূলীয় ভূমিধসও দেখা গেছে।
ফাইভোলকসের প্রকাশ করা একাধিক ছবিতে দেখা যায়, উন্মুক্ত হয়ে পড়া সমুদ্রের তলদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রবাল, সি-গ্রাস, মৃত মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী।
বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন বিশ্লেষণেও এই তথ্যের সত্যতা মিলেছে। তারা নিশ্চিত করেছেন, ২০২৬ সালের ১৬ মে থেকে ১০ জুনের মধ্যে দক্ষিণ ফিলিপাইনে উল্লেখযোগ্য 'কোস্টাল আপলিফট' ঘটেছে।
জিওস্পেশিয়াল বিশ্লেষক সের্জিও অগাস্টো জারডিম ভলকমার লিঙ্কডইন-এ ওই দুই পৃথক তারিখের সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনা করে একটি মানচিত্র পোস্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন, 'সত্যিই, এটি এমন এক ব্যাপক আপলিফট, যা এর আগে অন্য কোনো সময় খুব একটা দেখা যায়নি।'
প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অভ ফায়ার অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ফিলিপাইনে ভূমিকম্প নিয়মিত ঘটনা। এই অঞ্চলটি মূলত ফল্ট লাইন ও জীবন্ত আগ্নেয়গিরির বলয়।
কোটাবাটো খাতের নড়াচড়াই ১৯৭৬ সালে প্রলয়ংকরী মোরো উপসাগরীয় ভূমিকম্প ও সুনামির জন্ম দিয়েছিল। এতে প্রায় ৮ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে-র তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইন সি প্লেটের সীমানা বরাবর সিসমিক কার্যকলাপের ফলে ৮ মাত্রার চেয়েও বেশি শক্তিশালী সাতটি বড় ভূমিকম্প এবং ৭ মাত্রার বেশি অন্তত ২৫০টি বিশাল কম্পন সৃষ্টি হয়েছে। এর পাস্পাসি বেশ কয়েকবার সুনামি সৃষ্টি হয়েছে।
