বাঙ্কার-বাস্টার বোমাও যেখানে অসহায়, ইরানের ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ নিয়ে দুশ্চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যাকে 'পারমাণবিক ধুলা' বলছেন—তা এই ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে গত জুনের মার্কিন বোমা হামলা এবং ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া টানা পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পরও একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনা সম্পূর্ণ অক্ষত রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, 'পিক্যাক্স মাউন্টেন' নামের এই স্থাপনাটি মাটির এত গভীরে যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী 'বাঙ্কার-বাস্টার' বোমার পক্ষেও সেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, স্থাপনাটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। তবে তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই পিক্যাক্স মাউন্টেনই হয়ে উঠতে পারে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এমন এক আস্তানা, যেখানে আকাশপথে হামলা চালানো অসম্ভব।
সম্প্রতি ট্রাম্প যখন ইরানে বোমা হামলা চালাচ্ছিলেন, তখন কট্টরপন্থীরা তাকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থল অভিযানের পরামর্শ দেন। তারা চেয়েছিলেন, বিশেষ বাহিনীর (স্পেশাল ফোর্স) সদস্যদের দিয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরক পুঁতে স্থাপনাটি ধ্বংস করা হোক। স্থাপনাটিতে রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দেওয়ারও প্রস্তাবও এসেছে।
অন্যদিকে যারা সংঘাতের বদলে আলোচনার পক্ষে, তারা এসব ধারণাকে 'অবাস্তব' বলে মনে করেন। তাদের মতে, পিক্যাক্স মাউন্টেনের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে আটকানো অসম্ভব।
এখন যেহেতু ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথে হাঁটছেন, তাই এই দুই পক্ষের কর্মকর্তারা চাইছেন যেকোনো চুক্তিতেই পিক্যাক্স মাউন্টেন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার শর্ত থাকতে হবে।
পাহাড়ের গভীরে কী তৈরি করছে ইরান
স্থানীয়ভাবে 'কুহ-ই কোলাং গাজ লা' নামে পরিচিত এই পিক্যাক্স মাউন্টেন নিয়ে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। তবে স্যাটেলাইট ছবির তথ্য অনুযায়ী, জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তিনটি প্রধান স্থাপনা অকেজো হওয়ার পরপরই এখানে দ্রুতগতিতে নির্মাণকাজ শুরু করে ইরান।
গত এপ্রিলে ইরানে যুদ্ধ শুরুর কারণ হিসেবে এই তৎপরতার কথা উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, 'তিনটি স্থাপনায় হামলার পর ইরানের নেতারা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জায়গায় তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় চালুর চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা তাদের একটুও কমেনি।' বিশ্লেষকদের মত, ট্রাম্প মূলত এই পিক্যাক্স মাউন্টেনের দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন।
গত জুনে 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার'-এর আওতায় ফোরদোতে পাহাড়ঘেরা একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টার বোমা, যা বিশেষভাবে ওই অভিযানের জন্যই তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির মতে, ফোরদোর চেয়েও অন্তত ২ হাজার ফুট নিচে গ্রানাইট পাথরের স্তরের ভেতর অবস্থিত পিক্যাক্স মাউন্টেন। ফলে ওই ভয়ংকর বোমার পক্ষেও এর ভেতরের প্রকোষ্ঠগুলোতে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জুইশ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অব আমেরিকার (জিনসা) নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্লেইস মিসজটাল বলেন, 'ফোরদোর চেয়ে পিক্যাক্স মাউন্টেন অনেক গভীর, বড় এবং সুরক্ষিত। এখানেই হয়তো তারা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে।'
সন্দেহ ও শঙ্কা
২০২০ সালে যখন এর নির্মাণকাজ শুরু হয়, তখন তেহরান জানিয়েছিল যে এখানে সেন্ট্রিফিউজ (যা দিয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হয়) তৈরির কারখানা হবে। ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি কারখানার বিকল্প হিসেবে এটি তৈরি হচ্ছে বলে জানানো হয়। কিন্তু ইরান এখনো আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) এই স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। এতে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ জোরালো হয়েছে যে ইরান হয়তো সামরিক মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্যই এটি ব্যবহার করতে চায়।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ ইরান হয়তো এরই মধ্যে পিক্যাক্স মাউন্টেনে লুকিয়ে ফেলেছে। আইএইএ-প্রধান রাফায়েল গ্রোসির মতে এই ইউরেনিয়ামের অর্ধেক জুনে হামলার শিকার ইসফাহান স্থাপনায় চাপা পড়ে আছে। বাকিটা কোথায়, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। এই ইউরেনিয়ামকে পারমাণবিক অস্ত্রে পরিণত করতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজন হবে।
এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেন, যেকোনো শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়েছে। তবে ইরান এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে।
যে কারণে হামলা সম্ভব নয়
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কেন এখনো পিক্যাক্স মাউন্টেনে বোমা ফেলেনি, এর পেছনে ইউরেনিয়াম মজুতের বিষয়টি একটি বড় কারণ হতে পারে। কারণ বোমা ফেললে যে ধ্বংসস্তূপ তৈরি হবে, সেটির জন্য ইউরেনিয়াম উদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের (এফডিডি) গবেষক আন্দ্রেয়া স্ট্রাইকার বলেন, পিক্যাক্স মাউন্টেন অকেজো করতে সম্ভবত সামরিক বাহিনীর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের (স্যাপার) পাঠাতে হবে, যারা ভেতরে শক্তিশালী বিস্ফোরক দিয়ে এটি উড়িয়ে দেবেন।
জিনসার প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী মাইকেল মাকভস্কি বলেন, 'ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যদি পুরোপুরি মুছে ফেলা না যায়, তবে একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হবে।'
ট্রাম্পের নীতির ঘোর বিরোধী কিছু পারমাণবিক বিশেষজ্ঞও পিক্যাক্স মাউন্টেন নিয়ে উদ্বিগ্ন। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ জোসেফ সিরিনসিওনে বলেন, 'উদ্বেগটা খুবই বাস্তবিক। কিন্তু সমস্যা হলো, এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া।' তিনি আরও বলেন, পিক্যাক্স মাউন্টেন অকেজো করাসহ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানোর একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায় হলো কূটনীতির মাধ্যমে তেহরানের সহযোগিতা আদায় করা।
এই স্থাপনাটি ইরানের ঠিক মাঝখানে, নাতাঞ্জ স্থাপনা থেকে মাত্র এক মাইল এবং তেহরান থেকে ২০০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। এখানে যুক্তরাষ্ট্র কোনো হামলা চালাতে গেলে হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমানের মতো ধীরগতির আকাশযানগুলোকে ইরানের আকাশসীমার অনেক গভীরে প্রবেশ করতে হবে। ফলে এসব আকাশযান নিচ থেকে আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকবে।
মাটিতে নামার পর মার্কিন সেনা ও প্রকৌশলীরা যখন স্থাপনাটি পর্যবেক্ষণ এবং ধ্বংসের চেষ্টা করবেন, তখন তারাও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সহজ নিশানায় পরিণত হবেন।
তবে এর আগে ইরান স্বেচ্ছায় নিজেদের পারমাণবিক স্থাপনা অকেজো করেছিল। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসন ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে চুক্তির আওতায় তারা আরাক পারমাণবিক চুল্লির মূল অংশ সরিয়ে সেখানে সিমেন্ট ঢেলে দিয়েছিল।
সম্প্রতি এক পডকাস্টে এফডিডি-র প্রধান নির্বাহী মার্ক ডুবোউইটজ সন্দেহ প্রকাশ করেন যে শুধু বিস্ফোরক দিয়ে এই স্থাপনা অকেজো করা সম্ভব হবে কি না। তিনি বলেন, এই কাজের জন্য হয়তো এমন কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করতে হবে, যাতে 'আগামী এক শ বছর কোনো মানুষ ওই এলাকায় ঢুকতেই না পারে।'
ইসফাহান স্থাপনা নিয়েও শঙ্কা মার্কিনিদের
মার্কিনিদের জন্য উদ্বেগের বিষয় কেবল পিক্যাক্স মাউন্টেনই নয়। ২০২৫ সালের মার্চে তেহরান আইএইএ-কে জানায় যে তারা ইসফাহানে একটি নতুন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি করেছে। কিন্তু সংস্থার কর্মকর্তারা এখনো সেখানে পরিদর্শনের সুযোগ পাননি। গত বছরের হামলার পরও এর সম্পর্কে অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে।
জিনসার নতুন এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসফাহানের এই স্থাপনাটিও সম্ভবত এত গভীরে যে বাঙ্কার-বাস্টার বোমা সেখানে পৌঁছাতে পারবে না। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই স্থানটি পরিদর্শন করতে হবে এবং প্রয়োজনে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে এটি অকেজো হয়ে যায়।
৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির আগে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, স্থাপনাটি অকেজো করতে ট্রাম্প কোনো স্থল অভিযানের কথা ভাবছেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই সংবাদমাধ্যমের কাছে আগেভাগে জানান না যে তিনি কী সামরিক পদক্ষেপ নেবেন বা নেবেন না। তবে তিনি (ট্রাম্প) স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পাবে না। এর জন্য সব বিকল্পই সব সময় খোলা আছে।'
