যুদ্ধে বড় তেল কোম্পানিগুলোর রমরমা: ঘণ্টায় বাড়তি মুনাফা করছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার
ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রথম মাসে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি তেল ও গ্যাস কোম্পানি প্রতি ঘণ্টায় ৩ কোটি ডলারের বেশি বাড়তি মুনাফা লুটেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। এই বিপুল লাভের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী সৌদি আরামকো, গাজপ্রম ও এক্সনমবিল। অর্থাৎ, জলবায়ু উদ্যোগের বিরোধিতা করা প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন ফুলেফেঁপে উঠছে।
যুদ্ধের কারণে গত মার্চে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেলে গড়ে ১০০ ডলারে পৌঁছায়। এতে ওই এক মাসেই কোম্পানিগুলো প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি (২৩ বিলিয়ন) ডলার বাড়তি মুনাফা করে। যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরতে তেল-গ্যাসের সরবরাহব্যবস্থার আরও কয়েক মাস লাগবে। দাম ১০০ ডলারের ঘরে থাকলে বছর শেষে কোম্পানিগুলোর পকেটে ঢুকবে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি (২৩৪ বিলিয়ন) ডলার। গবেষণা সংস্থা রিস্ট্যাড এনার্জির তথ্য ব্যবহার করে এই বিশ্লেষণটি করেছে গ্লোবাল উইটনেস।
কাটা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট
কোম্পানিগুলোর এই বাড়তি লাভ মূলত সাধারণ মানুষের পকেট কেটেই আসছে। গাড়ি চালাতে বা ঘরে আলো জ্বালাতে এখন তাদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর খরচও বেড়েছে। ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইতালি, জাম্বিয়া ও ব্রাজিলের মতো বহু দেশ জ্বালানির ওপর কর কমিয়েছে। এর ফলে জনকল্যাণে ব্যয় করার জন্য রাষ্ট্রগুলোর আয় কমে যাচ্ছে।
তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর এই 'যুদ্ধকালীন মুনাফার' ওপর বাড়তি কর (উইন্ডফল ট্যাক্স) বসানোর চাপ বাড়ছে। জার্মানি, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়ার অর্থমন্ত্রীরা ইউরোপীয় কমিশনের কাছে এই দাবি জানিয়েছেন। ৪ এপ্রিল দেওয়া এক চিঠিতে তারা লেখেন, 'যুদ্ধের কারণে যারা লাভবান হচ্ছে, সাধারণ মানুষের বোঝা কমাতে তাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।' এই কর থেকে পাওয়া অর্থে মূল্যস্ফীতি কমানো এবং ভোক্তাদের স্বস্তি দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করেন তারা।
সবচেয়ে বেশি লাভ আরামকোর
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিজয়ী সৌদি আরামকো। তেলের দাম ১০০ ডলার থাকলে ২০২৬ সালে তারা যুদ্ধ থেকেই ২ হাজার ৫৫০ কোটি ডলার মুনাফা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ২৫ কোটি ডলার লাভ করেছে এই কোম্পানি—সেই আয় তো রয়েছেই। উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে নেওয়া আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত করতে কয়েক দশক ধরে সফলভাবে কলকাঠি নাড়ছে সৌদি আরব।
বছর শেষে রাশিয়ার তিনটি কোম্পানি—গাজপ্রম, রোসনেফ্ট ও লুকওয়েল—প্রায় ২ হাজার ৩৯০ কোটি ডলার মুনাফা করতে পারে। এই সংঘাত প্রকারান্তরে ইউক্রেন যুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনের কোষাগারকেই সমৃদ্ধ করছে। একটি গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, মার্চ মাসে রাশিয়া প্রতিদিন গড়ে ৮৪ কোটি ডলারের তেল রপ্তানি করেছে, যা ফেব্রুয়ারির চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি।
যুদ্ধকালীন মুনাফা লুটতে পিছিয়ে নেই পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোও। তেলের দাম ১০০ ডলার থাকলে মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিল ২০২৬ সালে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার আয় করবে। ব্রিটিশ কোম্পানি শেলের ঘরে যাবে ৬৮০ কোটি ডলার। যুদ্ধ শুরুর পর এই কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। এক মাসে এক্সনমবিলের বাজারমূল্য ১১ হাজার ৮০০ কোটি এবং শেলের ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বেড়েছে।
আরেক প্রতিষ্ঠান শেভরন এই যুদ্ধ থেকে ৯২০ কোটি ডলার বাড়তি মুনাফা করার পথে রয়েছে। পিছিয়ে নেই কোম্পানির প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থও। গত জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে তিনি ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের শেয়ার বিক্রি করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন।
এ বিষয়ে সৌদি আরামকো, শেল এবং টোটালএনার্জিস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। আর এক্সনমবিল, শেভরন, গাজপ্রম ও পেট্রোব্রাস মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের আহ্বান
তেল-গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিল সতর্ক করে বলেছিলেন, 'জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিচ্ছে। এর জায়গা নিচ্ছে দাসত্ব ও বাড়তি খরচ।' নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, 'সূর্যের আলো কোনো ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথের ওপর নির্ভর করে না।'
গ্লোবাল উইটনেসের সংবাদ অনুসন্ধান বিভাগের প্রধান প্যাট্রিক গ্যালি বলেন, 'বৈশ্বিক সংকটের মুহূর্ত তেল কোম্পানিগুলোর জন্য বাম্পার মুনাফা বয়ে আনে, আর সাধারণ মানুষকে এর মূল্য চোকাতে হয়।'
এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জেস রালস্টন বলেন, 'এই সংকট আবারও প্রমাণ করল যে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করার জন্য কতটা চড়া মূল্য দিতে হয়।'
ই৩জি থিংকট্যাংকের জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ বেথ ওয়াকার বলেন, সরকারের উচিত এই অপ্রত্যাশিত মুনাফার ওপর কর বসানো এবং সেই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে কাজে লাগানো।
যেসব দেশ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে, তারা এই মূল্যবৃদ্ধি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেয়েছে। শুধু মার্চ মাসেই যুক্তরাজ্যে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ডের গ্যাস আমদানি বেঁচে গেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মারিয়া পাস্তুখোভা বলেন, ঘরবাড়ি বা শিল্পকারখানা যতদিন তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততদিন আমদানিকারক দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারের এই ধাক্কা সইতেই হবে।
