ইরানের বন্দর অবরোধে ট্রাম্পকে ‘না’ বলল ন্যাটো মিত্ররা
ইরানের বন্দর অবরোধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনায় সরাসরি অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ন্যাটো মিত্ররা। সোমবার (১৩ এপ্রিল) তারা জানায়, সংঘাত শেষ হওয়ার পরই কেবল তারা ভূমিকা রাখতে পারে।
ন্যাটো মিত্রদের এমন সিদ্ধান্তে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হতে পারেন এবং জোটের ভেতরে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্প বলেছেন, অবরোধ শুরু হওয়ার পর সেখানে ইরানের কোনো জাহাজ এলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তা ধ্বংস করে দেবে। ছয় সপ্তাহ ধরে চলা ইরান-সংঘাতের অবসানে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়া ভেস্তে যাওয়ার পরই তিনি এ পদক্ষেপের ঘোষণা দেন।
প্রথমে ট্রাম্প বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো আটকে দিতে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করবে। তবে পরে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, অবরোধটি কেবল ইরানের বন্দরগামী বা সেখান থেকে ছেড়ে আসা জাহাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান নিজেদের জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। তারা প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী করতে এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজ থেকে শুল্ক আদায়ের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে।
রোববার ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, "অবরোধ খুব শিগগিরই শুরু হবে। এই অবরোধে অন্যান্য দেশও যোগ দেবে।"
তবে ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ ন্যাটো মিত্ররা জানিয়েছে, তারা অবরোধে অংশ নিয়ে সংঘাতে জড়াবে না। বরং তারা এমন একটি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে, যার মাধ্যমে প্রণালিটি উন্মুক্ত রাখা যায়। সাধারণত এই পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
অবরোধে অংশ না নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের আরেকটি মতবিরোধের বিষয় হয়ে উঠেছে। এর আগে মতবিরোধের জেরে সামরিক জোট ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এছাড়া ইরানে হামলার জন্য কয়েকটি দেশ মার্কিন সামরিক বিমান চলাচলে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় ইউরোপ থেকে কিছু মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ও বিবেচনা করছেন ট্রাম্প।
এদিকে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, "আমরা এই অবরোধকে সমর্থন করছি না। যে কোনো ধরনের চাপ—এবং কিছু উল্লেখযোগ্য চাপও ছিল—তা সত্ত্বেও আমাদের সিদ্ধান্ত খুবই স্পষ্ট, আমরা এই যুদ্ধে জড়াব না।"
গত সপ্তাহে কূটনীতিকরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে ইউরোপীয় দেশগুলোকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রাম্প শিগগিরই নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চান।
রুটে বৃহস্পতিবার বলেন, ন্যাটোর ৩২ সদস্য দেশ যদি একটি মিশন গঠনে একমত হয়, তাহলে এই প্রণালিতে ন্যাটো জোটের ভূমিকা থাকতে পারে।
তবে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে সহায়তা দিতে প্রস্তুত, কিন্তু তা হবে কেবল তখনই যখন সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটবে এবং ইরানের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতা হবে যাতে তাদের জাহাজে হামলা না হয়।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জানান, প্রণালিতে নৌচলাচল স্বাভাবিক করতে বহুজাতিক একটি মিশন গঠনের লক্ষ্যে ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে একটি সম্মেলনের আয়োজন করবে ফ্রান্স।
মাখোঁ বলেন, "এই মিশনটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক হবে এবং যুদ্ধে জড়িত পক্ষগুলো এর বাইরে থাকবে। পরিস্থিতি অনুকূল হলেই এটি মোতায়েন করা হবে।"
সোমবার পার্লামেন্টে স্টারমার বলেন, নিরাপদ নৌচলাচলের জন্য নিয়ম নির্ধারণ এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এর মাধ্যমে তেলবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সামরিক জাহাজগুলোর সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, "আমি খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই উদ্যোগ মূলত নৌপরিবহন সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সংঘাত শেষ হওয়ার পর নৌচলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য নেওয়া হচ্ছে। আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য হলো সমন্বিত, স্বাধীন ও বহুজাতিক একটি পরিকল্পনা।"
এদিকে ফ্রান্সের এক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, উপসাগরীয় দেশসহ ভারত, গ্রিস, স্পেন, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন—প্রায় ৩০টি দেশকে নিয়ে এই মিশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে বৈঠকটি আগামী বৃহস্পতিবারই প্যারিস বা লন্ডনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সূত্র আরও জানায়, এই মিশনে সামরিক জাহাজগুলো কোনো সংঘাতে জড়াবে না; বরং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিষয়ে অবহিত করা হবে, তবে তারা সরাসরি এতে অংশ নেবে না।
