বেপরোয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প খুঁজছে বিরক্ত ‘মধ্যম শক্তির’ মিত্র দেশগুলো
তুরস্কের আন্তালিয়ায় সদ্য সমাপ্ত কূটনৈতিক সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম খুব একটা উচ্চারিত হয়নি। তবে আলোচনার বড় অংশ জুড়েই ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেপরোয়া পররাষ্ট্রনীতি এবং ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের আঞ্চলিক সমস্যাগুলো নিজেদেরই সামলানোর ওপর জোর দিচ্ছে তুরস্কসহ 'মধ্যম শক্তির' দেশগুলো।
ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েক ডজন রাষ্ট্রপ্রধান ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই সম্মেলনে অংশ নেন। রোববার শেষ হওয়া তিন দিনের এই আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টি বারবার উঠে আসে।
সমাপনী সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, 'এই অঞ্চল যদি কোনো ত্রাতার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, তবে অনন্তকাল ধরে এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হবে।' এর বদলে রাষ্ট্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের আঞ্চলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে বলে জানান তিনি।
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে দীর্ঘদিনের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি পাল্টে ফেলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জাতিসংঘের সমালোচনা করেছেন, ন্যাটো ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রসারের নীতি থেকে সরে এসেছেন। মিত্রদের শত বাধা সত্ত্বেও ইসরায়েলকে নিয়ে ইরানে যুদ্ধ শুরু করেছেন তিনি। এতে বিশ্ব অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক মার্কিন মিত্র দেশও ইরানের প্রতিশোধের নিশানায় পরিণত হয়েছে।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া লন্ডনের আরবিসি ব্লুবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অর্থনীতিবিদ টিমোথি অ্যাশ বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে ইরানে পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প খোঁজার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে।'
তুরস্কের জন্য বড় এক কূটনৈতিক মঞ্চ
পঞ্চম বছরে পা দেওয়া এই ফোরাম পশ্চিমা বলয়ের বাইরের দেশগুলোর কাছে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এই মঞ্চ কাজে লাগিয়ে তুরস্ক নিজেদের সফল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। যেমন, সম্মেলনের প্রথম দিন ইউক্রেনের তরফ থেকে রুশ আগ্রাসন মোকাবিলার অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। আর পরের দিন একই মঞ্চে রাশিয়া জানায়, পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে তাদের সঙ্গে বৈরী আচরণ করেছে।
শুক্রবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেন, বিশ্বব্যবস্থা এখন 'নৈতিক ও অস্তিত্বের সংকটে' পড়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের সমালোচনা করে বলেন, 'পৃথিবী মানে কেবল পাঁচটি দেশ নয়। এটি তার চেয়েও বড়।'
গাজায় গণহত্যা এবং লেবানন, সিরিয়া ও ইরানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচনা করেন এরদোয়ান। তিনি জানান, তুরস্ক ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত। তবে যুদ্ধ শুরুর জন্য তিনি রাশিয়ার কোনো সমালোচনা করেননি। এমনকি ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করলেও, সুসম্পর্ক থাকায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত ছিলেন।
তবে অনেক অংশগ্রহণকারী ইরান সংঘাত নিয়ে নিজেদের হতাশা প্রকাশ করেন। জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি আক্ষেপ করে বলেন, 'যে যুদ্ধ আমরা ঠেকাতে চেয়েছিলাম, সেই যুদ্ধের কারণেই বিনা প্ররোচনায় আমরা ইরানের হামলার শিকার হচ্ছি।'
মার্কিন দূতের বিতর্কিত মন্তব্য
সম্মেলনে দুজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক এক সাক্ষাৎকারে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, 'বিশ্বের এই অংশটি (মধ্যপ্রাচ্য) কেবল ক্ষমতাকেই সম্মান করে। ক্ষমতা দেখাতে না পারলে আপনি পিছিয়ে পড়বেন।'
ব্যারাক আরও দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে কেবল 'উদার রাজতন্ত্র' এবং এ ধরনের শাসনব্যবস্থাই কার্যকর হয়েছে। ২০১০ সালের আরব বসন্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'যারা গণতন্ত্রের চাদর গায়ে জড়িয়েছে বা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেছে, তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছে।'
উল্লেখ্য, সম্মেলনের ফাঁকে তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে একটি বৈঠক করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের জোট পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারবে না।
চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক গালিপ দালে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র এখনো এই অঞ্চলের অনেকের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু তারা নির্ভরযোগ্য নয়, আবার জবরদস্তিমূলক আচরণও করে। এমন একটি অপরিহার্য অথচ খামখেয়ালি দেশের সঙ্গে কীভাবে বোঝাপড়া সম্ভব?'
গালিপ মনে করেন, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশ নিজেদের মতো করে আঞ্চলিক উদ্যোগ নিতে থাকবে। তবে তারা কেবল সেই দেশগুলোকেই জোটে নেবে, যাদের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আপত্তি নেই।
