ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ: বড় ধরনের যুদ্ধের শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ এক বিশাল ও অনির্দিষ্টকালের সামরিক তৎপরতা হতে পারে, যা তেহরানের পক্ষ থেকে নতুন করে প্রতিশোধমূলক হামলা এবং বর্তমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা থেকে কোনো সমাধান না আসার পর এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ করা বা সেখান থেকে বের হওয়া যে কোনো জাহাজ অবরোধের প্রক্রিয়া শুরু করবে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) পরবর্তীতে জানায় যে, এই অবরোধ কেবল ইরানের দিকে যাওয়া বা ইরান থেকে আসা জাহাজগুলোর ওপর কার্যকর হবে। এর আওতায় আরব সাগর ও ওমান উপসাগরে অবস্থিত ইরানের সকল বন্দর অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ওয়াশিংটন সময় সোমবার সকাল ১০টা থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বলে সেন্টকম জানিয়েছে।
ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, যে সকল জাহাজ ইরানকে 'টোল' প্রদান করেছে, সেগুলোকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকলেও মার্কিন বাহিনী বাধা দেবে। ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লেখেন, 'যারা অবৈধভাবে টোল পরিশোধ করবে, তারা গভীর সমুদ্রে নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ পাবে না।'
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে চাপের মুখে রাখা, যাতে দেশটি হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করে দেয়। বর্তমানে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা ইরান প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। ট্রাম্পের কৌশল সফল হলে ইরানের দরকষাকষির প্রধান শক্তিটি নষ্ট হয়ে যাবে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নৌ-অবরোধ মূলত একটি যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপ, যার জন্য বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতির প্রয়োজন। বাইডেন প্রশাসনের সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা ডানা স্ট্রাউল বলেন, 'ট্রাম্প একটি দ্রুত সমাধান চাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মিশন একা পরিচালনা করা কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।'
ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি
এই অবরোধ বাস্তবায়নে কতগুলো যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করা হবে বা মিত্র দেশগুলো সহায়তা করবে কি না, সে বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনও বিস্তারিত কিছু জানায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত যুদ্ধজাহাজ থাকলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারগুলোকে ভয় দেখাতে পারবে, কিন্তু অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে তারা কি ওই জাহাজগুলো জব্দ করবে বা ডুবিয়ে দেবে? বিশেষ করে যদি সেই জাহাজগুলো চীন, ভারত বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তির হয়, তবে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সাবেক মার্কিন নৌ-অপারেশন প্রধান অ্যাডমিরাল গ্যারি রুগহেড সতর্ক করে বলেছেন, এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান পারস্য উপসাগরের জাহাজগুলোতে হামলা চালাতে পারে অথবা মার্কিন ঘাঁটি আছে এমন দেশগুলোর অবকাঠামোতে আঘাত হানতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্প আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত তেলের দাম চড়া থাকতে পারে। এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করেছে, যা নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
গ্যাস ও তেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ
ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি না হওয়ায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প দেশটির ভেতরে মিসাইল কারখানায় পুনরায় হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট সেনেটর মার্ক ওয়ার্নার এই কৌশলের সমালোচনা করে বলেছেন, ইরান যদি স্পিডবোট দিয়ে মাইন পুঁতে রাখে বা ট্যাঙ্কারে বোমা হামলা চালায়, তবে তেলের দাম কমার বদলে আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হলেও তেহরান এখন ওয়াশিংটনের জন্য আরও বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তাদের হাতে এখন কট্টরপন্থী নেতৃত্ব এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুদ রয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, 'কোনো ইরানি যদি আমাদের ওপর বা শান্তিপূর্ণ জাহাজের ওপর গুলি চালায়, তবে তাদের জাহান্নামে পাঠিয়ে দেওয়া হবে!'
এর জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রণালীর দিকে আসা যেকোনো যুদ্ধজাহাজকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এর কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
