হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি অবরোধ: বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নতুন সংকটে
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে তার দেশের নৌবাহিনীর অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ইরান যুদ্ধকে এক নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে তেল সংকটের ধাক্কার প্রভাব দীর্ঘায়িত করতে পারে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে অনেকেই "অবৈধ" হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এর লক্ষ্য হলো হরমুজের ওপর ইরানের সেই সার্বভৌমত্বের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করা, যেটি কিনা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ এই প্রণালি এতদিন কার্যত একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়েছে।
ইরান সম্প্রতি হরমুজে সামুদ্রিক মাইন পেতেছে, এটা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ সব মাইন শনাক্ত করা তাদের পক্ষেও সম্ভব নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা মাইন অপসারণ কার্যক্রম শুরু করেছে, যা ইরানের দাবি অনুযায়ী যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে কার্যত একটি 'টোল বুথ' ব্যবস্থা চালু করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। এর আওতায় জাহাজগুলোকে তাদের নথিপত্র জমা দিয়ে অনুমোদিত কোড নিতে হচ্ছে এবং একটি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রিত করিডরের মাধ্যমে আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তায় চলাচল করতে হচ্ছে। প্রতিটি জাহাজের জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি আদায়ের খবর পাওয়া গেছে।
ফলে তেহরান এখন কার্যত এক ধরনের "সামুদ্রিক দস্যুর" আচরণ করছে—পছন্দের দেশগুলোর জাহাজ থেকে টোল আদায় করে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। আজ ১৩ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া ট্রাম্পের অবরোধ এই ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে চায়। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব ইতোমধ্যে বলেছেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং দেশগুলোকে এই টোল না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, কারণ এটি বৈশ্বিক নৌপরিবহনে বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) স্পষ্ট করেছে, তাদের অবরোধ মূলত ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজকে লক্ষ্য করবে—পুরো প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজ নয়। এই পার্থক্য আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী এর বৈধতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচলের স্বাধীনতা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোটামুটি প্রশ্নাতীত ছিল, যদিও ইরান ১৯৫৯ সালে এবং ওমান ১৯৭২ সালে তাদের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেয়—যা বাস্তবে প্রণালিটিকে সংকুচিত করে। প্রণালীর সর্বনিম্ন প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল। তবুও উভয় দেশ "নির্বিঘ্ন চলাচল" নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা ইরানের বর্তমান পদক্ষেপে স্পষ্টত লঙ্ঘিত হচ্ছে।
১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখে এবং এই জলপথের ওপর একটি ইরানি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে, যাতে ২৯০ জন নিহত হন। এ ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রশাসন পরে দুঃখ প্রকাশ করে এবং ক্ষতিপূরণ দেয়, তবে দায় স্বীকার করেনি। ২০১১ সালে ইরান আবার হরমুজের নিয়ন্ত্রণ দাবি করলেও তা বাস্তবায়ন করেনি; ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতেও এই নৌপথের স্বাধীনতা নিয়ে কোনো স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না।
ইরান এখন হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্বকে যেকোনো শান্তি চুক্তির শর্ত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এর পাশাপাশি তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া, পারমাণবিক স্থাপনা ভাঙা বন্ধ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং বিদেশে জব্দ করা ইরানের আর্থিক সম্পদ ফেরত দেওয়ার দাবিও তুলেছে। ফলে তেহরান শুধু কৌশলগত সুবিধা নয়, স্থায়ী আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে—যা সমঝোতার সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করছে।
ট্রাম্পের অবরোধ ঘোষণা দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষে পুনরায় সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি সীমিতভাবে সামরিক অভিযান ফের শুরু করার কথাও বিবেচনা করছেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অবরোধ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সমর্থন পায়নি। যুক্তরাজ্য, যে দেশটি সম্পর্কে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তারা মাইন অপসারণ জাহাজ পাঠাবে, তারা এতে অংশ না নেওয়ার কথা জানিয়েছে। নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে লন্ডন বরং তারা ফ্রান্সসহ অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে একটি বৃহত্তর জোট গঠনের চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের বাইরে থেকেও কীভাবে এই নৌপথ পুনরায় চালু করা যায়—তা নিয়ে যুক্তরাজ্য প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে। এটি আইনি দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ: জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (আনক্লজ)-এর আওতায় একটি বহুপাক্ষিক জোট একক মার্কিন অবরোধের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত আইনি ভিত্তি তৈরি করবে।
তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং ভারত মহাসাগরে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের ঘটনায়—ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন উঠেছে।
এখন মার্কিন অবরোধ নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (আনক্লজ) গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এতে স্বাক্ষর করেনি; আবার ইরান স্বাক্ষর করলেও অনুমোদন দেয়নি; তবে ওমান এই সনদের সদস্য।
আনক্লজ-এর ৩৭–৪৪ অনুচ্ছেদ আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য ব্যবহৃত যেকোনো প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে। অধিকাংশ আইনজ্ঞের মতে, হরমুজ প্রণালিও এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।
এই আইনে জাহাজের "অবাধ চলাচল" ও "নৌচলাচলের স্বাধীনতা" নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে শর্ত হলো—বিলম্ব না করা, উপকূলীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা হুমকি না দেওয়া এবং চলাচলের সময় জাহাজ থেকে কোনো জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা না করা।
যদি উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো নির্দিষ্ট নৌপথ নির্ধারণ করতে চায়, তবে তা আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমোদন পেতে হবে।
এছাড়া তারা কোনোভাবেই বিদেশি জাহাজের বিরুদ্ধে বৈষম্য করতে পারবে না এবং "নির্বিঘ্ন চলাচল" স্থগিত করতে পারবে না।
ইরান দাবি করে, এই 'ট্রানজিট প্যাসেজ' আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ নয় এবং তারা ১৯৯৩ সালের নিজস্ব আইনের ভিত্তিতে পূর্বানুমতি ছাড়া চলাচল অনুমোদন করে না।
তবে এই অবস্থান দুর্বল। ইতিহাসে দ্বীপমালা, খাল ও প্রণালিগুলোতে নির্বিঘ্ন চলাচলের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতও বলেছে, এমনকি যুদ্ধরত দেশের যুদ্ধজাহাজের চলাচলও কোনো প্রণালির নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করে না।
কোনো রাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক নৌপথ বন্ধ করতে চায়, তা চুক্তির ভিত্তিতে করতে হয়—যেমন ১৯৩৬ সালের মন্ট্রো কনভেনশন অনুযায়ী, তুরস্ক নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বসফরাস প্রণালি বন্ধ করতে পারে।
কিন্তু কোনো প্রণালি-সংলগ্ন রাষ্ট্র একতরফাভাবে বাধা সৃষ্টি বা টোল আরোপ করতে পারে না—যা ইরান বর্তমানে করছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও আলবেনিয়াকে এই অধিকার দেয়নি, যখন তারা করফু চ্যানেলে বিদেশি যুদ্ধজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল।
তাছাড়া হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরকে সংযুক্ত করা একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ।
ইরান দাবি করছে, এটি কেবল তাদের প্রতি বৈরী নয় এমন দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত—কিন্তু বাস্তবে টোল আদায় ও মাইন স্থাপনের ফলে নৌচলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
এর মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দ্রুত বাড়ছে। মার্চের শুরুতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং মার্কিন অবরোধ ঘোষণার পর তা আরও ৭–৮ শতাংশ বেড়েছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্বালানি অর্থনীতিবিদ সতর্ক করেছেন, যুদ্ধ শেষ হলেও ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত তেলের উচ্চ মূল্য বজায় থাকতে পারে—কারণ জাহাজ মালিকরা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই পথে ফিরবে না।
উপসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমানে ২৩০টি তেলবাহী ট্যাংকার আটকে আছে। এই সামুদ্রিক অবরোধ অত্র অঞ্চলের ৮০ শতাংশ খাদ্য আমদানিও ব্যাহত করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বে ৩০ শতাংশ ইউরিয়া সার এই পথ দিয়ে রপ্তানি হয়—যা বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
২০২৬ সালের ১১ মার্চ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজ্যুলিউশন-২৮১৭ এই প্রণালিতে অবাধ চলাচলের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে। এতে ১৯৮৪ সালের রেজ্যুলিউশন ৫৫২-এর উল্লেখ করা হয়, যেখানে পারস্য উপসাগরে নৌচলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল।
এই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালিতে হামলা ও হুমকির নিন্দা জানানো হয়েছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়, আর রাশিয়া ও চীন বিরত থাকে।
তবে আইনি দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও ইরান এই ইস্যুতে ছাড় দেবে না বলেই মনে হয়। ফলে যুদ্ধ ছাড়া বিকল্প হতে পারে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যাওয়া—তবে ইরান এই আদালতের বাধ্যতামূলক এখতিয়ার স্বীকার করেনি, ফলে এটি জটিল প্রক্রিয়া।
তবে আইনি দুর্বলতা থাকলেও দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার শেষে আদালত অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়কেই অবরোধ কার্যক্রম বন্ধ করতে বলতে পারে—যা উভয় পক্ষের জন্যই একটি সম্মানজনক বেরিয়ে আসার পথ হতে পারে।
তবে ইরান এই রায় অমান্য করতে পারে—যেমন দক্ষিণ চীন সাগরে 'নাইন-ড্যাশ লাইন' ইস্যুতে চীন করেছিল।
সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ওপর চাপ কমবে এবং অন্যান্য দেশও আইনি ভিত্তিতে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারবে।
ইরানের বক্তব্য স্পষ্ট—তারা হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব চায়। এই নজির প্রতিষ্ঠিত হলে চীনও তাইওয়ান প্রণালিতে একই দাবি তুলতে পারে—যা পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরের দেশগুলোর জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
