ইরান যুদ্ধ: মহাশক্তির খেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করছে এক দীর্ঘ সংঘাত
"শত্রু যখন ভুল করছে, তাকে কখনো বাধা দিও না"-
বিখ্যাত ফরাসি সমরনায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্টের এই বহুল উদ্ধৃত নীতিবাক্যটি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মস্কো ও বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল বলেই মনে হয়। একই সময়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছিল।
এখন যখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে—এবং উভয় পক্ষই "বিজয়" দাবি করছে—তখনও রাশিয়া ও চীনের নেতাদের সামনে সুযোগ রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ কৌশলগত ভুল থেকে লাভবান হওয়ার।
এই কয়েক সপ্তাহব্যাপী সংঘাতে চীন ও রাশিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখেছে। ইরানকে—যাকে দুই দেশই বিভিন্ন মাত্রায় মিত্র হিসেবে দেখে—তারা পূর্ণ সমর্থন দেয়নি, কিংবা এই যুদ্ধে বড় ধরনের কোনো মূল্যও দেয়নি।
বরং তারা সীমিত সহায়তার পথ বেছে নিয়েছে—ক্ষুদ্র পরিসরের গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে।
জেফ্রি টালিয়াফেরো এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত তার মতামত কলামে লিখেছেন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পরাশক্তির রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করা একজন বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, এর পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বেইজিং ও মস্কো খুব ভালোভাবেই জানত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ইরানের "জয়" সম্ভব নয়। বরং ইরানের জন্য টিকে থাকাটাই যথেষ্ট—কারণ সেটিই ওয়াশিংটনের প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের স্বার্থ রক্ষা করে।
নিচে সেই চারটি উপায় তুলে ধরা হলো, যার মাধ্যমে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ একবিংশ শতকের মহাশক্তির প্রতিযোগিতায় ওয়াশিংটনের অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে—
১. মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাবের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়া
আমার বই "ডিফেন্ডিং ফ্রেনেমিস" এ ব্যাখ্যা করেছি, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে পরস্পরবিরোধী লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এটি ছিল সোভিয়েত প্রভাব সীমিত রাখা এবং একই সঙ্গে ইসরায়েল ও পাকিস্তানের মতো জটিল মিত্রদের পারমাণবিক সক্ষমতা সামাল দেওয়ার।
২০২০-এর দশকে এসে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়—চীন এবং তুলনামূলকভাবে কম মাত্রায় রাশিয়ার প্রভাব সীমিত করা।
কিন্তু শি জিনপিং এবং ভ্লাদিমির পুতিন-এর নেতৃত্বে চীন ও রাশিয়া বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক জোট ও অনানুষ্ঠানিক কৌশলের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে সেটি হলো ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই সম্পর্কের গভীরতা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনোন্মুখ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তেহরানের সঙ্গে মস্কোর যৌথভাবে কাজ করার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে চীন কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছে—বিশেষ করে ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কুটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখে।
সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের বিদ্রূপাত্মক দিক হলো, এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীনের জন্য পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদের পতন হলে রাশিয়া অত্র অঞ্চলে তার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মিত্রকে হারায়। আর ২০২৫ সালের মে মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর উপসাগরীয় দেশগুলো সফরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের সঙ্গে বড় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চুক্তি—চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল।
কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমেই এই অঞ্চলের অনির্ভরযোগ্য রক্ষক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই অবস্থায়, উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদার খুঁজতে পারে।
২. কৌশলগত অগ্রাধিকার থেকে মনোযোগ সরে যাওয়া
গত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে রাশিয়া ও চীন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়েছে, যেখানে ইরাক ও আফগানিস্তানে ব্যয়বহুল যুদ্ধের পর ওয়াশিংটন অঞ্চলটি থেকে মনোযোগ সরাতে চেয়েছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত—তার প্রশাসনের ২০২৫ সালের নভেম্বরের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই কৌশলে পশ্চিম গোলার্ধ ও ইন্দো-প্যাসিফিককে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব "ক্রমশ কমবে" বলেও উল্লেখ করা হয়।
ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে—এবং তা করার আগে অন্য মিত্রদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই—ট্রাম্প তাদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীনতা দেখিয়েছেন। ফলে ইতিমধ্যেই বিভক্ত ন্যাটো সামরিক জোটে আরও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের লক্ষণ দেখাচ্ছে।
চীন ও রাশিয়ার জন্য এটি সুফল হয়েই দেখা দিচ্ছে, কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে যেকোনো বিভেদকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে আসছে।
আবারও রুঢ় বাস্তব হলো, ইরান যুদ্ধ এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ভালোই এগোচ্ছিল। আন্তর্জাতিক আইন বা বৈধতার প্রশ্ন বাদ দিলেও, ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে একটি অনুগত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল ওয়াশিংটন।
৩. অর্থনৈতিক প্রভাবের অসম ভারসাম্য
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল রপ্তানির পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া—ইরানের এই পদক্ষেপ যেমন পূর্বানুমেয় ছিল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ছিল ধ্বংসাত্মক।
কিন্তু রাশিয়ার জন্য এর অর্থ ছিল তেলের উচ্চমূল্য, যা তাদের যুদ্ধ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কিছুটা শিথিলতা—যা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপে থাকার পর মস্কোর জন্য অনেকটা স্বস্তি হয়েই এসেছে।
দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ও ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি চীনের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে অবশ্যই আঘাত করছে, তবে শি জিনপিং আপাতত এই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বলেই মনে হয়।
দেশীয় তেল মজুত বৃদ্ধি এবং সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক ব্যাটারি ও কয়লার মতো বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে চীন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত আছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং অভ্যন্তরীণ ভোগ চাহিদা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি তৈরি করেছে, যা ইরান যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে তাদের সহায়তা করেছে এবং অর্থনীতিকে নিজস্ব পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে।
এই বাস্তবতায়, হরমুজ প্রণালির ঘটনাপ্রবাহের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি নিয়ন্ত্রণ হারাবে, ততই মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব কমবে—যেহেতু ইরান তার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করছে।
৪. বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবক্ষয়
আলোচনা পরিত্যাগ করে যুদ্ধে যাওয়ার ট্রাম্পের আগ্রহ এবং ইরান সংঘাতে তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য—যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখার ধারণাকে দুর্বল করেছে।
এর ফলে চীনের জন্য একটি বড় 'সফট পাওয়ার' হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি গ্রহণে ইরানকে রাজি করাতে বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এভাবে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারীর অবস্থান ক্ষয় করছে চীন।
এর আগে ইরান-সৌদি সম্পর্ক পুনঃস্থাপনেও সফলভাবে মধ্যস্থতা করেছে বেইজিং, এবং রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতেও একই ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
সার্বিকভাবে, ইরান যুদ্ধ বেইজিংয়ের সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তিশালী করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শেষ হয়ে এসেছে বলে ধরা হয়। যুদ্ধ চলতে থাকলে চীন কিছুটা লাভবান হলেও, যুদ্ধবিরতিতে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতা করার সিদ্ধান্ত দেখায়—চীন ক্রমশ সেই বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে শুরু করেছে, যা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া ছিল।
ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্প ও ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে এই ইস্যুতে বিরোধ—বিশ্বের দৃষ্টি ও যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। রাশিয়ার জন্য এটা কম কোনো পাওয়া নয়।
লেখক: জেফ্রি টালিয়াফেরো যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।
