নৌ-অবরোধ কী? হরমুজ প্রণালিতে এটি কীভাবে কার্যকর হবে?
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আজ (১৩ এপ্রিল) থেকে তারা ইরানের বন্দরে প্রবেশকারী এবং সেখান থেকে বহির্গামী সকল ধরণের নৌ-চলাচলের ওপর অবরোধ শুরু করবে।
তারা আরও জানিয়েছে, অন্য কোনো গন্তব্যে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি পাবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ বন্ধে উভয় পক্ষের মধ্যস্থতাকারীরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে কারণ ইরান তার 'পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক'।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এই আলোচনার ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের 'অতিরিক্ত দাবি এবং বেআইনি অনুরোধকে' দায়ী করেছেন।
অবরোধ নিয়ে ট্রাম্প কী বলেছেন?
গত রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করা বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা 'যেকোনো এবং সব ধরণের জাহাজ অবরোধ' শুরু করতে যাচ্ছে।
ট্রাম্প বলেন, 'আমি আমাদের নৌবাহিনীকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা সেই সব জাহাজ খুঁজে বের করে আটক করার নির্দেশ দিয়েছি, যারা ইরানকে টোল প্রদান করেছে। অবৈধভাবে টোল প্রদানকারী কোনো জাহাজকে আন্তর্জাতিক সমুদ্রে নিরাপদে যাতায়াত করতে দেওয়া হবে না।'
তিনি আরও জানান, ইরান ওই জলপথে যেসব মাইন পেতে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো ধ্বংস করা শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র।
কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, 'কোনো ইরানি যদি আমাদের ওপর বা কোনো শান্তিপূর্ণ নৌযানের ওপর গুলি চালায়, তবে তাঁদের পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।'
ট্রাম্পের মতে, কোনো এক সময় মুক্তভাবে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে একটি সমঝোতা হবে। তবে তার অভিযোগ, 'কোথাও হয়তো মাইন আছে'—ইরানের এমন অস্পষ্ট দাবির কারণেই বিষয়টি পিছিয়ে যাচ্ছে; কারণ ওই মাইনের খবর ইরান ছাড়া আর কেউ জানে না।
অন্য একটি পোস্টে তিনি যোগ করেন, 'ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তারা জেনেশুনে তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।' তিনি সতর্ক করে বলেন, 'যেহেতু তারা কথা দিয়েছিল, তাই তাদের ভালো হবে যদি তারা দ্রুত এই আন্তর্জাতিক জলপথটি উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে।'
কীভাবে কার্যকর হবে এই নৌ-অবরোধ?
মার্কিন নৌবাহিনীর ২০২২ সালের এক নির্দেশিকা অনুযায়ী, নৌ-অবরোধ হলো এমন এক সামরিক অভিযান যার মাধ্যমে শত্রু বা নিরপেক্ষ—যেকোনো দেশের জাহাজ ও বিমানকে কোনো নির্দিষ্ট শত্রুদেশের বন্দর, বিমানঘাঁটি বা উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ করতে বা সেখান থেকে বের হতে বাধা দেওয়া হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনী এই অবরোধের প্রক্রিয়া 'অবিলম্বে কার্যকর' করবে। তবে পরে রোববার তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে জানান, এতে কিছুটা সময় লাগলেও এটি 'খুব দ্রুতই কার্যকর হবে'। তিনি তার এই পদক্ষেপকে 'সব বা কিছুই না' নীতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের বাহিনী সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে এই অবরোধ কার্যকর করা শুরু করবে।
সেন্টকমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, 'পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের সকল ইরানি বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় আসা বা সেখান থেকে যাওয়া সকল দেশের জাহাজের ওপর কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই এই অবরোধ প্রয়োগ করা হবে।'
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, ইরানি বন্দর বাদে অন্য দেশের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর স্বাধীন চলাচলে মার্কিন বাহিনী কোনো বাধা দেবে না। এই অবরোধ শুরুর আগে বাণিজ্যিক নাবিকদের একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই অভিযানে অন্য দেশগুলোও জড়িত থাকবে। তবে, তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট দেশের নাম বলেননি। কিন্তু বিবিসি জানতে পেরেছে, যুক্তরাজ্য সরাসরি এই অবরোধ কার্যকরের প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে না।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে আরও বলেন, ন্যাটো এই জলপথ 'পরিষ্কার' করতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে খুব শীঘ্রই জলপথটি আবার ব্যবহার উপযোগী হবে। তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ওই অঞ্চলে মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজ (মাইনসুইপার) পাঠাবে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এর আগেই জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মাইন শনাক্তকারী ব্যবস্থাগুলো ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে অবস্থান করছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, 'আমরা নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টি সমর্থন করছি, যা বিশ্ব অর্থনীতি সচল রাখতে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি।'
ওই মুখপাত্র আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি কোনোভাবেই 'টোল আদায়ের' বিষয় হওয়া উচিত নয়। তারা ফ্রান্স ও অন্যান্য অংশীদারদের সাথে মিলে একটি বড় জোট গঠনের কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন আইনি বিশেষজ্ঞ বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই অবরোধ সামুদ্রিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। এমনকি একজন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন, সামরিক শক্তির মাধ্যমে কার্যকর করা এই অবরোধ বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরিপন্থী কি না।
কেন হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
হরমুজ প্রণালির বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে পুরো যুদ্ধ চলাকালীন ইরান বিভিন্ন দেশের ওপর এক ধরণের কৌশলগত চাপ তৈরি করেছে। তেহরান এই সরু জলপথটি ব্যবহার করে বেছে বেছে নির্দিষ্ট কিছু জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে এবং এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামও আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তেহরান কিছু জাহাজকে পার করে দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বা টোল আদায় করছে।
ট্রাম্পের এই নৌ-অবরোধের মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের আয়ের এই বড় উৎসটি বন্ধ করে দেওয়া। যদিও এই পদক্ষেপের ফলে তেল ও গ্যাসের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।
ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, 'ইরান তাদের পছন্দের মানুষের কাছে তেল বেচে টাকা কামাবে আর যাদের পছন্দ করে না তাদের যেতে দেবে না—এমনটা আমরা হতে দেব না।' তার নীতি হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে হয় সবাই যাতায়াত করবে, নতুবা কেউই পারবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে বাধ্য হয়।
সিবিএস নিউজের 'ফেস দ্য নেশন' অনুষ্ঠানে ওহাইওর রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক টার্নার বলেন, হরমুজ প্রণালির সংকট নিরসনে এই অবরোধ একটি অন্যতম মাধ্যম। তার মতে, প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে কারা যাতায়াত করবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শুধু ইরানের একার নয়। এর মাধ্যমে তিনি আসলে সব মিত্র এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানাচ্ছেন।
তবে ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর এবং সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির শীর্ষ সদস্য মার্ক ওয়ার্নার সিএনএনকে বলেন, 'আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে এই জলপথ অবরোধ করে ইরানকে সেটি উন্মুক্ত করতে বাধ্য করা যাবে।'
এর প্রভাব কী হবে?
স্বল্পমেয়াদে ট্রাম্পের এই নৌ-অবরোধের হুমকির প্রভাব খুব সামান্যই হবে বলে মনে করছেন জাহাজ চলাচল বিশেষজ্ঞ লার্স জেনসেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, বর্তমানে এই জলপথ দিয়ে খুব অল্পসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে। মার্কিনরা যদি এই অবরোধ কার্যকরও করে, তবে তা কেবল হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজকে থামাবে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এতে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না।
ভেসপুচি মেরিটাইমের প্রধান নির্বাহী লার্স জেনসেন আরও বলেন, ইরানকে টোল দেওয়া জাহাজগুলোর চলাচল আটকে দেওয়ার হুমকিরও খুব একটা প্রভাব পড়বে না। কারণ যেকোনো কোম্পানি যদি ইরান সরকারকে অর্থ প্রদান করে, তবে তারা এমনিতেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে।
জেনসেনের মতে, 'প্রথমত, এখন খুব কম জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করছে। টোল দেওয়া জাহাজের সংখ্যা তার চেয়েও কম। আর যারা টোল দিচ্ছে, তারা আগে থেকেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে।'
তিনি আরও জানান, অধিকাংশ জাহাজ কোম্পানি এখন একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির জন্য অপেক্ষা করবে এবং দেখবে সেই চুক্তি বজায় থাকে কি না। যদি সত্যিই শান্তি ফেরে, তবে এই পথে ধীরে ধীরে আবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি কী?
গত ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। এই চুক্তির অন্যতম একটি শর্ত ছিল এই সরু জলপথ দিয়ে জাহাজগুলোর 'নিরাপদ যাতায়াত' নিশ্চিত করা।
তবে বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ওই এলাকায় চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়, অনুমতি ছাড়া প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের 'লক্ষ্যবস্তু করা হবে এবং ধ্বংস করে দেওয়া হবে'। ফলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার প্রথম তিন দিনে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ এই পথে যাতায়াত করার সাহস দেখিয়েছে।
মেরিন ট্রাফিক থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ১০ এপ্রিল স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা পর্যন্ত মাত্র ১৯টি জাহাজকে এই প্রণালি পার হতে দেখা গেছে।
এই ১৯টি জাহাজের মধ্যে মাত্র চারটি ছিল তেল, গ্যাস বা রাসায়নিকবাহী ট্যাংকার। বাকিগুলো ছিল বিভিন্ন ধরনের পণ্যবাহী (বাল্ক ক্যারিয়ার) কন্টেইনার জাহাজ। এছাড়া, কিছু জাহাজ নিজেদের অবস্থান প্রকাশ না করেই এই পথ পাড়ি দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার আগে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ যাতায়াত করত। সেই তুলনায় বর্তমান সংখ্যাটি অত্যন্ত নগণ্য।
