ইরানে সেনা উদ্ধারের তথ্য ফাঁসকারী সূত্রের নাম না জানালে সাংবাদিককে জেলে পাঠানোর হুমকি ট্রাম্পের
একটি সংবাদ সংস্থাকে তাদের অজ্ঞাত সূত্রের নাম প্রকাশ করতে বাধ্য করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জানা গেছে, সূত্রটি ইরানে নিখোঁজ হওয়া একজন মার্কিন বিমান বাহিনীর সদস্যের খুঁটিনাটি তথ্য প্রকাশ করেছিল। বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ওই নিখোঁজ বিমানবাহিনীর সদস্যের বিষয়ে প্রতিবেদন করেছিল। পরবর্তীতে তাকে তার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর উদ্ধার করা হয়।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, 'আমরা ওই তথ্যফাঁসকারীকে খুঁজে বের করার জন্য খুব কঠোর চেষ্টা চালাচ্ছি। ওই ফাঁসকারী তথ্য দেওয়ার আগে তারা জানতই না যে কেউ নিখোঁজ আছে। তাই যেই হোক না কেন, আমরা তাকে খুঁজে বের করতে পারব বলে মনে করি। কারণ আমরা সেই মিডিয়া কোম্পানির কাছে যাব যারা এটি প্রকাশ করেছে এবং আমরা বলব—জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে হয় নাম বলুন, নয়তো জেলে যান।'
ট্রাম্প, যিনি প্রায়ই সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়ান, তিনি কোন সংবাদমাধ্যমের কথা বলছিলেন তা উল্লেখ করেননি। হোয়াইট হাউস ও বিচার বিভাগ তার বক্তব্য নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে করা প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান তাদের ভূখণ্ডে পাইলট নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি কেবল মিডিয়া রিপোর্ট থেকেই জানতে পেরেছে এবং এই প্রচারের ফলে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান জটিল হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, 'হঠাৎ করে তারা জানতে পারে সেখানে কেউ আছে। তারা দেখে এত বিমান আসছে। এটি অনেক বেশি কঠিন অভিযানে পরিণত হয়েছিল কারণ একজন তথ্যফাঁসকারী তথ্য দিয়েছিল যে আমরা একজনকে উদ্ধার করেছি, কিন্তু সেখানে আরও একজন আছে যাকে আমরা উদ্ধারের চেষ্টা করছি।'
তিনি ওই তথ্য ফাঁসকারী সূত্রকে 'অসুস্থ ব্যক্তি' বলে অভিহিত করেন, যদিও বলেন, 'সম্ভবত সে বুঝতে পারেনি বিষয়টি কতটা গুরুতর।' তবুও তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি এই প্রতিবেদন করেছে, সে যদি সূত্র না জানায়, তাহলে তাকে জেলে যেতে হবে—এবং এটি বেশিদিন লাগবে না।'
২০২৫ সালে বিচার বিভাগ বাইডেন আমলের সেই নীতি বাতিল করে দেয় যা তথ্য ফাঁস সংক্রান্ত ঘটনা তদন্তের সময় সাংবাদিকদের সমন বা সাবপিনা থেকে সুরক্ষা প্রদান করত।
ওয়াশিংটন পোস্ট সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের মুখোমুখি হয়েছে। গত জানুয়ারিতে সরকারি নথিপত্র অবৈধভাবে রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ঠিকাদারের তদন্তের অংশ হিসেবে পোস্টের এক নারী সাংবাদিকের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয় এবং তার ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো জব্দ করা হয়।
তবে মার্চে একজন ফেডারেল ম্যাজিস্ট্রেট বিচারক সরকারকে ওই সাংবাদিকের ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো তল্লাশি করতে বাধা দেন।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাইট ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জামিল জাফর এক বিবৃতিতে বলেন, সংবাদমাধ্যমের সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার আছে জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার, এমনকি সরকার যেগুলো গোপন রাখতে চায় সেগুলোও।
তিনি বলেন, 'সাংবাদিকদের তাদের সূত্রের নাম প্রকাশে বাধ্য করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে মারাত্মক উদ্বেগের সৃষ্টি করে। কারণ সাংবাদিকদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তাদের সূত্রের পরিচয় গোপন রাখা। ট্রাম্পের এই হুমকিকে সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানো এবং জনগণের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত।'
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স নর্থ আমেরিকার নির্বাহী পরিচালক ক্লেটন ওয়েইমার্স বলেন, ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এই ধরণের হুমকি এটিই প্রথম নয় এবং সম্ভবত এটিই শেষ নয়।
তিনি বলেন, 'এটি শুধু ট্রাম্পের কথার ফুলঝুরি নয়। আমাদের উচিত তাকে গুরুত্ব সহকারে এবং আক্ষরিক অর্থেই নেওয়া। এই একই ট্রাম্প প্রশাসন একজন বিচারককে বিভ্রান্ত করে ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক হান্না ন্যাটানসনের কাজ ও ব্যক্তিগত ডিভাইস জব্দ করেছিল। একই প্রশাসন মিনেসোটায় প্রতিবেদন করার কারণে ডন লেমন ও জর্জিয়া ফোর্টকে গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত করেছিল। এই প্রশাসন মনে করে সাংবাদিকতা একটি অপরাধ।'
