দক্ষিণ লেবাননে বিশাল এক ‘বাফার জোন’ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা ইসরায়েলের
হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে দক্ষিণ লেবাননের এক বিশাল এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, লেবানন-ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে লিতানি নদীর ওপর থাকা সেতুগুলো উড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেখানে একটি নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে তোলা হবে এবং উত্তর ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের ফিরতে দেওয়া হবে না।
কাটজের দাবি, হিজবুল্লাহ যোদ্ধা ও অস্ত্র পরিবহনে ব্যবহৃত পাঁচটি সেতু ধ্বংস করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা শুরু হয়, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানোর পর। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয় বলে জানানো হয়। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হিজবুল্লাহর ওপর প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে আসছিল ইসরায়েল।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১,০৭২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১২১ জন শিশু ও ৪২ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন।
এতে এক মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা দেশটির বিদ্যমান মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের হিজবুল্লাহর হামলা থেকে রক্ষা করাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য।
২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতির পর উত্তরাঞ্চলের অনেক ইসরায়েলি বাসিন্দা নিজ নিজ শহরে ফিরতে শুরু করেছিলেন। এর আগে প্রায় দেড় বছর ধরে হিজবুল্লাহর রকেট হামলার কারণে তারা ঘরে ফিরতে পারেননি।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও তাদের সরিয়ে নিতে হলে তা বাসিন্দাদের পাশাপাশি ইসরায়েলি সরকারের জন্য বড় ধাক্কা হবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পরদিনই ইসরায়েলি অবস্থানে হিজবুল্লাহ হামলা চালালে সংঘর্ষ দ্রুত বেড়ে যায় এবং ইসরায়েল পাল্টা জবাব দেয়।
মঙ্গলবার প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে কাটজ বলেন, তাদের লক্ষ্য হলো 'একটি প্রতিরক্ষামূলক এলাকা তৈরি করা এবং হুমকি দূরে রাখা'। এ কৌশল গাজার রাফাহ ও বেইত হানুন অঞ্চলে অনুসৃত মডেলের মতো, যেখানে ব্যাপক বিমান হামলায় বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে এবং এলাকা এখনো ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বর্তমানে লেবাননের ভেতরে প্রবেশ করে একটি সামনের প্রতিরক্ষা লাইন দখল করছে, হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের নির্মূল করছে এবং তাদের স্থাপনাগুলো ধ্বংস করছে। সীমান্তের কাছে থাকা কিছু ঘরবাড়িও ধ্বংস করা হচ্ছে, যেগুলো হিজবুল্লাহ ব্যবহার করত বলে দাবি করা হয়েছে।
কাটজ বলেন, দক্ষিণ লেবাননের বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ লিতানি নদীর দক্ষিণে ফিরতে পারবেন না, যতক্ষণ না উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
দক্ষিণ লেবানন মূলত দেশটির শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান আবাসভূমি এবং হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি। তবে এখানে খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজনও বসবাস করেন।
২০২৪ সালে যুদ্ধ শেষ করতে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমর্পণ করে দক্ষিণাঞ্চলের অবস্থান ছাড়ার কথা ছিল। এই প্রক্রিয়া তদারকি করার দায়িত্ব ছিল লেবানন সরকার ও সেনাবাহিনীর।
কিছু অগ্রগতি হলেও তা ছিল আংশিক। অন্যদিকে ইসরায়েলও দক্ষিণ লেবাননে কয়েকটি সামরিক অবস্থান ধরে রাখে এবং হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তু দাবি করে নিয়মিত হামলা চালিয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার ইচ্ছা লেবানন সরকারের থাকলেও, তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের কখনোই ছিল না। পাশাপাশি লেবানন রাষ্ট্র ও হিজবুল্লাহর মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে, যা আবারও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, লেবানন সরকার 'কিছুই করেনি' বলেই এখন তারা পদক্ষেপ নিচ্ছে।
অন্যদিকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইসরায়েলের এই পরিকল্পনাকে 'বেসামরিক মানুষের ওপর সমষ্টিগত শাস্তি' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কাটজ যে 'প্রতিরক্ষামূলক বাফার জোন' তৈরির কথা বলেছেন, তা ১৯৮৫ সালে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল যে বাফার জোন গড়ে তোলে, তার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। সেই অঞ্চলটি ২০০০ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সে সময় হিজবুল্লাহর ধারাবাহিক হামলায় ইসরায়েলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নিহত ও আহত সেনাদের নিয়মিত হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য জনমতকে ওই নীতির বিরুদ্ধে নিয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে হিজবুল্লাহ বলছে, দক্ষিণাঞ্চল দখল ঠেকাতে তারা আবারও লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। সংগঠনটির শীর্ষ নেতা হাসান ফাদলাল্লাহ এটিকে 'অস্তিত্বের জন্য হুমকি' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, 'এই আগ্রাসনের মোকাবিলা করা এবং এই ভূমিতে টিকে থাকা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই।'
