সত্তরের দশকের চেয়েও ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে বিশ্ব: আইইএ প্রধান
বিশ্ব বর্তমানে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এবং ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাবের চেয়েও ভয়াবহ এক জ্বালানি সংকটের মোকাবিলা করছে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল।
সোমবার (২৩ মার্চ) অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে এক মিডিয়া ইভেন্টে আইইএ-র নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল বলেন, 'ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের তেল সংকট এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে সৃষ্ট গ্যাস ঘাটতি— এই সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।'
বিরল বলেন, 'পরিস্থিতি যেদিকে দাঁড়িয়েছে, তাতে বর্তমান সংকটটি মূলত দুটি তেল সংকট এবং একটি গ্যাস সংকটের সম্মিলিত রূপ।'
আইইএ প্রধান জানান, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ১১ মিলিয়ন (১ কোটি ১০ লাখ) ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে। এটি সত্তরের দশকের সংকটগুলোর সম্মিলিত ঘাটতির চেয়েও দ্বিগুণের বেশি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ঘনমিটার কমেছে। অথচ ইউক্রেনে রুশ হামলার পর এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭৫ বিলিয়ন ঘনমিটার। বিরলের তথ্যমতে, চলমান এই সংঘাতে অন্তত ৯টি দেশের ৪০টি জ্বালানি স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, 'বিশ্ব অর্থনীতি আজ এক বিশাল হুমকির সম্মুখীন এবং আমি আশা করি এই সংকটের দ্রুত সমাধান হবে।'
আইইএ প্রধান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই সংকটের গভীরতা আগে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা হয়নি। এ কারণেই তিনি গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো পরিস্থিতি নিয়ে জনসমক্ষে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, 'আমার মনে হয়েছে বিশ্বের নীতি-নির্ধারকরা এই সমস্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নন।'
প্যারিসভিত্তিক এই আন্তঃসরকারি সংস্থাটি চলতি মাসের শুরুর দিকে তাদের জরুরি মজুদ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারগুলোর জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে—দূরবর্তী কর্মসংস্থান (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) ও কারপুলিং সুবিধা বাড়ানো এবং মোটরওয়েতে যানবাহনের গতিসীমা কমিয়ে আনা।
ফাতিহ বিরল জানান, প্রয়োজন হলে আরও কৌশলগত তেল মজুদ ছাড়ের বিষয়ে তিনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তবে তার মতে, এই সংকটের 'একমাত্র প্রধান সমাধান' হলো হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর বিপরীতে ইরান ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে কার্যকর অবরোধ তৈরি করেছে।
এদিকে পরিস্থিতি চরম উত্তেজনার দিকে মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত না করলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের দেওয়া এই সময়সীমা সোমবার সন্ধ্যায় (যুক্তরাষ্ট্র সময়) শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালায়, তবে তারা এই জলপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। পাশাপাশি পুরো অঞ্চলজুড়ে জ্বালানি ও পানি অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান।
বর্তমানে কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মিত্র নয় এমন কিছু দেশের অল্প সংখ্যক জাহাজ এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করছে।
