হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা: ঝুঁকিতে আমেরিকার জেনেরিক ওষুধের সরবরাহ
ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া একটি বড় ধরনের সামরিক কৌশল, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী। এটি কেবল তেলের উচ্চমূল্যই নয়, বরং ধাতু, উৎপাদন শিল্প, কৃষি এবং খাদ্যমূল্যের সরবরাহ শৃঙ্খলকেও ব্যাহত করছে। সরবরাহ শৃঙ্খল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে ইরানের এই প্রণালী চেপে ধরার চেষ্টা আমেরিকার ওষুধ শিল্পেও আঘাত হানবে।
এখন একমাত্র প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ আমেরিকার জন্য একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হওয়ার আগে জেনেরিক ওষুধের বর্তমান মজুদ কতদিন টিকে থাকতে পারবে।
মধ্যপ্রাচ্যের একটি সমুদ্রপথের সাথে আমেরিকার ফার্মেসি কাউন্টারের সংযোগ যতটা অস্পষ্ট মনে হয়, বাস্তবে এটি তার চেয়েও অনেক বেশি সরাসরি।
হেলসিংকি-ভিত্তিক ফার্মাসিউটিক্যালস সাপ্লাই চেইন সফটওয়্যার কোম্পানি 'রিলেক্স সলিউশনস'-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট রোহিত ত্রিপাঠীর মতে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের জেনেরিক প্রেসক্রিপশনের প্রায় অর্ধেক (ভলিউম অনুযায়ী প্রায় ৪৭ শতাংশ) ভারত থেকে পায়। ভারত আবার তার অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশের জন্য হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভর করে।
ত্রিপাঠী বলেন, "সেই তেল শেষ পর্যন্ত ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত পেট্রোকেমিক্যাল ইনপুট হিসেবে কাজে লাগে। তাই আমেরিকান ভোক্তারা সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ওষুধ না কিনলেও, তারা এমন একটি সরবরাহ শৃঙ্খলের শেষ প্রান্তে রয়েছেন যা ওই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।"
ভারতে অনেক ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় একাধিক উপাদান প্রথমে উপসাগরীয় অঞ্চলের লজিস্টিক হাবগুলোর মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে। চীনে উৎপাদিত রাসায়নিক উপাদানগুলো সাধারণত দুবাই এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন স্থানে ডিস্ট্রিবিউটররা একত্রিত করেন এবং এরপর সেগুলো ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারকদের কাছে পাঠানো হয়।
সাপ্লাই চেইন সফটওয়্যার ফার্ম ' ইনফিওস'-এর প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্লফ বলেন, "উপাদানগুলো সরাসরি চীন থেকে ভারতে গেলেও উৎপাদন প্রক্রিয়াটি উপসাগরীয় পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালীর বিশৃঙ্খলা দ্রুত বিশ্বব্যাপী ফার্মাসিউটিক্যাল সরবরাহ শৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদের প্রভাবিত করতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত জরুরি ওষুধের ঘাটতি এবং উচ্চমূল্য হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে।
লাস ভেগাসের নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল স্কুলের সাবেক ডিন মার্ক কান বলেন, "জ্বালানি খরচ সবকিছুর দামকে প্রভাবিত করবে, তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে জেনেরিক ওষুধের ওপর কারণ এগুলোতে লাভের মার্জিন খুব কম থাকে।"
কান গ্লিসারিনের কথা উল্লেখ করেন, যা একটি সাধারণ ওষুধের উপাদান এবং পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক। যদি তেলের সরবরাহ বন্ধ থাকে তবে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আরও বলেন, অ্যাসিটামিনোফেন সাধারণত ফেনল থেকে তৈরি হয়, যা পেট্রোলিয়াম থেকে পাওয়া একটি রাসায়নিক।
ইউসিএলএ-র ডেভিড গেফেন স্কুল অফ মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. উইলিয়াম ফেল্ডম্যান বলেন, "আমি বিশেষ করে জেনেরিক ওষুধ নিয়ে চিন্তিত, যা যুক্তরাষ্ট্রে পূরণ হওয়া প্রেসক্রিপশনের ৯০ শতাংশ এবং এগুলোর লাভের হারও খুব কম। ভারত ও চীন যুক্তরাষ্ট্রে জেনেরিক ওষুধের বৃহত্তম সরবরাহকারী। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত জেনেরিক কোম্পানিগুলোর খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা রোগীদের জন্য ওষুধের দাম বাড়াবে অথবা ঘাটতি তৈরি করবে।"
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সোমবার সকালে সিএনবিসি-কে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতসহ কয়েকটি দেশে তেল সরবরাহের জন্য তাদের ট্যাঙ্কার চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে।
রোহিত ত্রিপাঠীর মতে, সাম্প্রতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং মালবাহী ভাড়া বৃদ্ধি একটি সতর্কবার্তা, তবে এটি এখনও 'রেড অ্যালার্ট' নয়। তিনি বলেন, "মালের বাজারে ইতোমধ্যে প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখা দিচ্ছে। ভারত থেকে বিমানযোগে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়ছে এবং উৎপাদনকারীরা মজুদ নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করছেন।" তিনি মনে করেন, যদি প্রণালীটি বন্ধ থাকে তবে "ঘাটতি দৃশ্যমান হতে শুরু করবে।"
স্টিভ ব্লফের মতে, ভারত থেকে কিছু রুটে এয়ার কার্গোর ভাড়া ২০০ থেকে ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যেহেতু বেশিরভাগ ফার্মেসি এবং পাইকারি বিক্রেতারা জেনেরিক ওষুধের ক্ষেত্রে 'জাস্ট-ইন-টাইম' (তৎক্ষণাৎ সরবরাহ) ইনভেন্টরি মডেল অনুসরণ করে, তিনি সতর্ক করেছেন যে এই ব্যাঘাত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে ভোক্তাদের সামনে দৃশ্যমান হতে পারে। প্রথমে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের মতো উচ্চ চাহিদার ওষুধে ঘাটতি দেখা দেবে এবং পরবর্তীতে এটি ক্যানসার চিকিৎসার মতো তাপমাত্রা-সংবেদনশীল থেরাপিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্ট্যানফোর্ড হেলথ কেয়ারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আমান্ডা চাওলা বলেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দাম তত বেশি বাড়বে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।
তিনি কেবল ওষুধ নয়, ইনসুলিন সিরিঞ্জ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং গ্লাভস নিয়েও উদ্বিগ্ন, যেগুলোর উৎপাদনে পেট্রোলিয়াম প্রয়োজন। তেলের দাম বাড়লে এই পণ্যগুলোর উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে।
সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বিষয়টি আরও জটিল। জাহাজ চলাচলে দেরি হওয়ায় কেবল ওষুধের খরচ বা সময় বাড়ছে না, বরং কোল্ড-চেইন (শীতলীকরণ) ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
অনেক ওষুধের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা প্রয়োজন। জাহাজ চলাচলের রুট পরিবর্তনের ফলে অনেক কন্টেইনার বন্দরে আটকা পড়ছে যেখানে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। এছাড়া খালি কন্টেইনারের সংকটও দেখা দিচ্ছে, যা ভারত থেকে নতুন চালান পাঠাতে বাধা সৃষ্টি করছে।
ভারত থেকে ওহাইও—আজই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই
স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি হলো সময়ের। ত্রিপাঠীর মতে, বেশিরভাগ প্রস্তুতকারক এবং ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে ৩০ থেকে ৬০ দিনের বাফার স্টক থাকে। তাই প্রথম দুই থেকে চার সপ্তাহ পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হতে পারে। তবে মজুদ ফুরিয়ে গেলে অ্যামোক্সিসিলিন, মেটোপ্রোলল বা মেটফরমিনের মতো সাধারণ ওষুধগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
কিন্তু ওহিও-র জার্মানটাউনে, যেখানে জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ হাজার এবং যা হরমুজ প্রণালী থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, সেখানকার পরিবেশ এখনও শান্ত।
স্থানীয় ফার্মাসিস্ট কেটি পেরি বলেন, পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক। তিনি মনে করেন, জাতীয় কৌশলগত মজুদ এবং কোভিডের অভিজ্ঞতা তাদের অনেক বেশি সহনশীল করে তুলেছে। একটি উৎস থেকে ওষুধ না পাওয়া গেলে বিকল্প উৎস থেকে তা সংগ্রহ করার ব্যবস্থা রয়েছে।
ভারতের ওষুধ উৎপাদন খাতের বার্তাও একই—রোগীদের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইন্ডিয়ান ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যালায়েন্সের মুখপাত্র ক্যাথলিন জেগার বলেন, স্বল্প মেয়াদে ওষুধ সংকটের ঝুঁকি নেই। এই শিল্প কোভিড এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বড় বড় বিপর্যয় সামলেছে, তাই তারা এই সমস্যাও মোকাবিলা করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। তিনি জানান, অধিকাংশ কোম্পানির কাছে ৩ থেকে ৬ মাসের ওষুধের মজুদ রয়েছে এবং তারা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনা করে রেখেছে।
সান ফার্মা, ডক্টর রেড্ডি'স ল্যাবরেটরিজ এবং লুপিনের মতো বড় বড় ভারতীয় কোম্পানিগুলোও এই বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে। এমনকি লুপিন ফ্লোরিডায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে নতুন উৎপাদন কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করছে যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি সরবরাহ বাড়ানো যায়।
ফার্মাসিস্ট পেরি বলেন, গ্রাহকরা যুদ্ধের কারণে ঘাটতি নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। তারা বরং বীমা কোম্পানি এবং ফার্মেসির মধ্যকার দাম নির্ধারণের জটিলতা নিয়ে বেশি ভাবছেন। এখন পর্যন্ত আলমারিতে ওষুধ আছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা নজর রাখছেন এটি আর কতদিন স্থায়ী হয়। ব্লফ বলেন, "এই অঞ্চলটি ওষুধের কার্গো চলাচলের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট।"
