‘আমরা শুধু প্রার্থনাই করছিলাম’ – যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরান থেকে পালানোর বর্ণনা পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস ছিল সেদিন। ২৩ বছর বয়সী পাকিস্তানী মেডিকেল শিক্ষার্থী মুহাম্মদ রেজা ইরানের রাজধানী তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস–এর হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে চিকিৎসকদের রোগী দেখতে সহায়তা করছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে পুরো ওয়ার্ড থমকে যায়। দিনটি ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি, ওইদিন সকালে যৌথভাবে ইরানের ওপর বোমাবর্ষণ শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার ইসলামাবাদগামী একটি বাস থেকে আল জাজিরাকে রেজা বলেন, "সম্ভাব্য হামলার কথা আমরা আগে থেকেই শুনছিলাম। কিন্তু যখন সত্যিই হামলা শুরু হলো, তখন আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তায় শরীর কেঁপে উঠেছিল।"
বোমাবর্ষণের পর পুরো তেহরান শহরে যখন বিশৃঙ্খলা ও ভয় ছড়িয়ে পড়ে, তখন রেজা দ্রুত হাসপাতালের কাছে তার হোস্টেলে ফিরে যান এবং পাকিস্তান দূতাবাসে ফোন করেন।
দূতাবাস থেকে তাকে এবং অন্য শিক্ষার্থীদের জানানো হয়, সন্ধ্যার মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে একত্র হতে, যাতে তাদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা যায়।
রেজা বলেন, "পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ ছিল। আমরা সবাই আতঙ্কিত ছিলাম—কি হতে পারে তা নিয়ে। যত দ্রুত সম্ভব পাকিস্তানে ফিরতে চাইছিলাম।"
আরেক পাকিস্তানী মেডিকেল শিক্ষার্থী মুহাম্মদ তৌকির আল জাজিরাকে জানান, হামলা শুরু হওয়ার সময় তিনি কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে ফিল্ড ডিউটিতে ছিলেন।
মঙ্গলবার নিজের জন্মশহর পাঞ্জাব প্রদেশের জং জেলায় ফেরার পথে আরেকটি বাস থেকে কথা বলতে গিয়ে ২৪ বছর বয়সী তৌকির বলেন, "তেহরানে প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়। মানুষজন রাস্তায় বেরিয়ে আসে। আমাদের শিক্ষকরা বিদেশি শিক্ষার্থীদের দ্রুত নিজ নিজ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে হোস্টেলে ফিরে যেতে বলেন। আমরাও তাই করি।"
তৌকির বলেন, "আমি তখনই আমার পরিবারকে ফোন করে পরিস্থিতির কথা জানাই।"
তেহরানে পাকিস্তান দূতাবাসের পক্ষ থেকে নিজ নাগরিকদের শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে সেখানে উপস্থিত হতে বলা হয়। শত শত মানুষ সেখানে জড়ো হন—সঙ্গে ছিল কাপড়চোপড়, ল্যাপটপ, পাঠ্যপুস্তক, গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং নগদ অর্থসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
শনিবার রাতে দূতাবাস প্রাঙ্গণ থেকে পাঁচটি বাস ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাহেদান–এর উদ্দেশে রওনা হয়। প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রা শেষ করতে সময় লাগে প্রায় ২০ ঘণ্টা।
বাসের কনভয়টি ইরানের মধ্যাঞ্চল দিয়ে এগোয়। পথিমধ্যে ইয়াজদ, ইস্পাহান, কেরমান শহর অতিক্রম করার সময় সেখানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা চলছিল।
যাত্রাপথে শিক্ষার্থীরা ইরান যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতির খবর জানার চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে সংঘাতটি দ্রুত আঞ্চলিক রূপ নেয়, কারণ ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে শুরু করে।
আরেক পাকিস্তানী শিক্ষার্থী কাইনাত মাকসুদ বলেন, সেই "গভীরভাবে উদ্বেগময়" যাত্রাপথেই তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খোমেনির নিহত হওয়ার খবর জানতে পারেন।
পাঞ্জাবের মুলতান শহরে যাওয়ার বাসে ওঠার অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় তিনি বলেন, "খবরটা আমাদের জন্য খুবই মর্মান্তিক ছিল। তিনি এমন একজন নেতা ছিলেন, যাকে আমাদের অনেকেই শ্রদ্ধা করতাম—এখন আর তিনি আর নেই।"
'পুরো বাস ছিল নীরব'
জাহেদান থেকে পাকিস্তানের সীমান্ত শহর তাফতানের সীমান্ত ক্রসিং প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে। যাত্রাপথের প্রায় পুরোটা সময়ই যাত্রীদের মোবাইল ফোনে কোনো সিগন্যাল ছিল না।
তৌকির বলেন, "আমরা সবাই ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। রাতের যাত্রা ছিল, সামনে কি হতে পারে তা আমরা জানতাম না। পুরো বাস ছিল একেবারে নীরব। সবাই শুধু প্রার্থনা করছিল।"
রোববার সন্ধ্যায় বাসগুলো পাকিস্তানে প্রবেশ করে। মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানী কর্মকর্তারা জানান, গত তিন দিনে প্রায় ১,০০০ নাগরিক—এর মধ্যে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী দেশে ফিরেছেন তাফতান সীমান্ত ক্রসিং এবং গাবদ-রিমদান সীমান্ত দিয়ে।
এই দুই সীমান্তপথই পাকিস্তানের সবচেয়ে অস্থির প্রদেশ বালুচিস্তানে অবস্থিত, যেখানে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা বেড়েছে। তাই নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ইরান থেকে আসা কনভয়কে রাতে চলাচল করতে দেয়নি।
তবে পাকিস্তানে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীরা অবশেষে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন।
মুহাম্মদ রেজা বলেন, "পাকিস্তানে ঢোকার পর মোবাইল ফোন চালু হতেই আমি পরিবারকে জানাই যে খুব শিগগিরই তাদের সঙ্গে দেখা হবে।" রেজার বাড়ি পাকিস্তানের মনোরম এক প্রদেশ গিলগিট-বালটিস্তানের স্কার্দু এলাকায়।
'আমি আবার ফিরে যেতে চাই'
সোমবার সকালে বাসগুলো বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার উদ্দেশে রওনা হয়। পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশের বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তর পাড়ি দিয়ে এই যাত্রাও ছিল প্রায় ১২ ঘণ্টার ক্লান্তিকর ভ্রমণ।
কোয়েটায় পৌঁছানোর পর, সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা একে অন্যের থেকে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ ঠিকানায় রওয়ানা হন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তৌকির আল জাজিরাকে ফোনকলে জানান, "আমি খুব ক্লান্ত। শুধু বাড়ি গিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই।" ফোনে কথা বলার সময় তার জংগামী বাসের হর্নের শব্দও তখন শোনা যাচ্ছিল।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে প্রায় ৩৫ হাজার পাকিস্তানী নাগরিক বাস করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩,০০০ শিক্ষার্থী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন—যার মধ্যে রয়েছে তেহরান, ইসফাহান, জানজান ও ইয়াজদ শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ।
ইরানের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসলেও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে।
তৌকির বলেন, "আমার ডিগ্রি শেষ হতে মাত্র দুই থেকে তিন মাস বাকি। ২০২১ সালে তেহরানে পড়তে গিয়েছি। এত কম সময় বাকি থাকতে আমি কোনোভাবেই আমার ডিগ্রি হাতছাড়া করতে চাই না।" তিনি বর্তমানে এমবিবিএস প্রোগ্রামের শেষ সেমিস্টারে আছেন।
অন্যদিকে এমবিবিএসের শেষের আগের সেমিস্টারে থাকা রেজা ভাবছেন, আদৌ তিনি আবার কলেজে ফিরতে পারবেন কি না।
তিনি বলেন, "আমাকে ফিরে যেতে হবে। আমি ফিরতে চাই। আমার মাত্র এক বছর বাকি। কিন্তু বাস্তবে পারব কি না জানি না। আশা করি পরিস্থিতি ভালো হবে এবং আমি আবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাব। আপাতত আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।"
রেজার মতোই কাইনাত মাকসুদেরও পড়াশোনা শেষ হতে এক বছরের কম সময় বাকি। তবে তিনি শুধু পড়াশোনার জন্যই নয়, অন্য কারণেও ইরানে ফিরতে চান।
মুলতানের বাসে ওঠার আগে তিনি বলেন, "মুসলমানদের পক্ষে যেভাবে ইরান লড়ছে, তেমন করে আর কোনো দেশ লড়ছে না। সংহতি প্রকাশের জন্য হলেও আমি আবার সেখানে ফিরে যেতে চাই।"
