মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাব: বাজারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তেল সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে কানাডা
হরমুজ প্রণালি "বন্ধ" ঘোষণা ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তেলের দাম বেড়েছে গতকাল মঙ্গলবার। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্ববাজার অস্থির হয়ে উঠছে। তবে এই পরিস্থিতি কানাডার জন্য অনুকূল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সোমবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালিটি বন্ধ ঘোষণা করে সতর্ক করে দেয়—কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে তা হামলার মুখে পড়বে বা "আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে"। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলছে, নৌপথটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ নয়, তবু জাহাজ চলাচল প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্বের বড় শিপিং কোম্পানি মায়েরস্ক, হ্যাপাগ-লয়েড, এবং এমএসসি প্রণালি অতিক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
এপ্রিল মাসে ডেলিভারির জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মঙ্গলবার প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে দিনের একপর্যায়ে ৮৫ ডলারে পৌঁছায়—২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর এই প্রথম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের সীমা অতিক্রম করল ব্রেন্ট। একই সময়ে সংশ্লিষ্ট ডব্লিউটিআই সূচকে তেলের দামও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে সামান্য বেড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে মন্দায় থাকা তেল-গ্যাস খাতের বিনিয়োগকারীরা অবশ্য কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের ১১টি খাতের মধ্যে এনার্জি খাত শীর্ষে রয়েছে। খাতটির বহুল ব্যবহৃত সূচকভিত্তিক ফান্ড স্টেট স্ট্রিট এনার্জি সিলেক্ট সেক্টর বা এসপিডিআর ইটিএফ (এক্সএলই) চলতি বছরে প্রায় ২৪ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে, যেখানে এসঅ্যান্ডপি সূচকভুক্ত কোম্পানিগুলোর রিটার্ন নেতিবাচক ১ শতাংশে রয়েছে।
তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কানাডার জন্য বেশি ইতিবাচক হতে পারে। টরেন্টোভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান নাইনপয়েন্ট পার্টনার্স-এর জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ম্যানেজার এরিক ন্যুটালের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কানাডার জন্য "বিরাট সুযোগ", যা দেশটিকে একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ তেল সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
ব্লুমবার্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ন্যুটাল বলেন, অয়েল স্যান্ডস ও ক্লিয়ারওয়াটার ফরমেশনে কয়েক দশকের মজুত থাকার কারণে কানাডা অনন্য অবস্থানে রয়েছে। আলবার্টার ক্লিয়ারওয়াটার ফরমেশনে উচ্চ সান্দ্রতাসম্পন্ন ভারী তেল ও বিটুমেনের বিশাল মজুত রয়েছে; কোল্ড লেক এলাকায় কেবল ভূগর্ভস্থ সম্ভাব্য মজুতের পরিমাণই ৭০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি বলে ধারণা করা হয়। উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে এবং ২০৩১ সালের মধ্যে দৈনিক উৎপাদন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।
ন্যুটাল ইরানের সরবরাহ হঠাৎ হারানো এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়াকে বিনিয়োগকারীদের জন্য "সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি" এবং ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, অতীতে তেলের দাম বাড়লেই বাজারে দ্রুত বিক্রির প্রবণতা দেখা গেলেও—এবার সেই প্রবণতা নাও প্রযোজ্য হতে পারে।
জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা-জোগানের বর্তমান ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলায় নতুন রপ্তানি পাইপলাইন অনুমোদনের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। কানাডীয় পার্লামেন্টকে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল সক্ষমতার একটি নতুন প্রকল্পসহ অতিরিক্ত পাইপলাইন অনুমোদনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
