ইরানি নেতাদের বেছে বেছে হত্যা করছে ইসরায়েল: এই কৌশল কি ফলপ্রসূ হবে?
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েল। দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের দাবি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও সামরিক সক্ষমতার এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গত মঙ্গলবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এই হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা দেন।
এর আগে গত রাতে চালানো এক হামলায় ইরানের আধাসামরিক বাহিনী 'বাসিজ'-এর কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানিও নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
যুদ্ধের শুরুর দিনেই তেহরানের এক কম্পাউন্ডে বিমান হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তাঁর শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যার পর, লারিজানি ও সোলাইমানির মৃত্যু ইরানের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
ইসরায়েল এখন তার যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে 'টার্গেটেড কিলিং' কৌশলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ইরানের সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলা এবং ভেতরের নিরাপত্তা বাহিনীকে দুর্বল করার মাধ্যমে সেখানে একটি গণঅভ্যুত্থানের সুযোগ তৈরি করা।
এ বছরের শুরুতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী যখন হাজার হাজার নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছিল, তখন থেকেই ইসরায়েলের এই কৌশল আরও জোরালো হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভিডিও বার্তায় তার দেশের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, 'আমরা যদি এই পথে অবিচল থাকি, তবে তাদের ভাগ্য তাদের নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার একটি সুযোগ আমরা তৈরি করে দেব।'
আর দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ আরও আক্রমণাত্মক সুরে বলেছেন, তিনি সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন ইরানের নেতাদের খুঁজে খুঁজে বের করা হয়।
তিনি বলেন, 'অক্টোপাসের মাথা বারবার কেটে ফেলতে হবে, একে বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।'
ইসরায়েলের শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকে ১২ জন ইসরায়েলি অ্যাথলেট হত্যার পর ইসরায়েল তাদের খুনিদের খুঁজে বের করে হত্যার এক দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালিয়েছিল।
২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে 'দ্বিতীয় ইন্তিফাদা' চলাকালে তারা বহু ফিলিস্তিনি নেতাকে হত্যা করেছে। আর ২০২৪ সালে বৈরুতে বিমান হামলায় হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহকেও তারা হত্যা করে।
ইসরায়েলের কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই কৌশল ইরানকে এতটা কোণঠাসা করে ফেলবে যে, সরকার তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা করতে বাধ্য হবে।
মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা সিমা শাইন বলেন, 'হিজবুল্লাহ নেতা নাসরুল্লাহর মৃত্যুতে দলটি এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে তারা ২০২৪ সালের শেষের দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও হয়তো একসময় তারা বলবে—আমাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়।'
বাসিজ বাহিনীর কমান্ডারদের নির্মূল করা হলে এর নিচের সারির সদস্যরাও মনোবল হারিয়ে ফেলবে বলে তিনি মনে করেন।
তবে ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, লারিজানির মতো শীর্ষ নেতাদের হত্যা হিতে বিপরীত হতে পারে। শাইন বলেন, লারিজানি বরং নমনীয় বা বাস্তববাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তার মৃত্যুতে কট্টরপন্থীদের শক্তি আরও বাড়তে পারে, যেমনটা ঘটতে পারে আইআরজিসি প্রধান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফের ক্ষেত্রে।
তিনি বলেন, 'তারা যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করছে। আইআরজিসিকে শক্তিশালী করার অর্থ হলো প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে অবমাননাকর শর্ত দেওয়া।'
অনেকে মনে করেন, ইরানের নেতৃত্বের ভিত্তি এতই গভীর যে ইসরায়েল তাদের সরকারকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে পারবে না।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, 'নেতৃত্ব ধ্বংস করা একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু শুধু এর ওপর ভিত্তি করে কৌশল সাজানো যায় না। কারণ একজন নেতা মরলে ইরান তার জায়গায় অন্য কাউকে বসিয়ে দেওয়ার মতো গভীর সক্ষমতা রাখে।'
তিনি আরও উদাহরণ দেন, গাজায় হামাসের প্রায় সব নেতাকে হত্যা করলেও তারা এখনো টিকে আছে এবং লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
একইভাবে নাসরুল্লাহ বা তার উত্তরসূরিকে হত্যার পরও হিজবুল্লাহ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা ও নৌবাহিনীর সাবেক কমান্ডার আমি আয়ালন (৮০) সতর্ক করেছেন যে, লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তিনি ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরবর্তী বিশৃঙ্খলার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
আয়ালন বলেন, 'আমরা ইরান শুধু নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক মহাবিপর্যয় বা বিশৃঙ্খলা তৈরির দ্বারপ্রান্তে রয়েছি।'
তার মতে, নেতানিয়াহুর 'গণঅভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরির' তত্ত্বটি বিভ্রান্তিকর অথবা ভুল।
তিনি বলেন, 'ধরে নিলাম নেতানিয়াহু ঠিক বলছেন। কিন্তু এ জন্য কয়েক মাস বা বছর লাগতে পারে।
সরকারের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষ জানে যে, যুদ্ধের পরের দিন তাদের কসাইয়ের মতো জবাই করা হবে। তাই তারা নিজেদের বাঁচাতে লড়াই করবে এবং মানুষ মারবে।'
তিনি আরও বলেন, 'দাবার বোর্ডে বোকারা মনে করে রাজাকে মারলেই খেলা জিতে যাওয়া যায়।
কিন্তু মতাদর্শের লড়াইয়ে যুদ্ধের ময়দানে প্রতিটি খেলোয়াড়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।'
