মশা কবে থেকে মানুষের রক্ত পানে অভ্যস্ত হলো?
পৃথিবীতে ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি প্রজাতির মশা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নতুন নতুন প্রজাতির সন্ধানও মিলছে। এমনকি 'অ্যানোফিলিস কিউলেক্স'-এর মতো পরিচিত মশাও আসলে একাধিক প্রজাতির সমষ্টি। জীববৈচিত্র্যের এমন উদাহরণ সত্যিই বিস্ময়কর।
অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশেই মশার রাজত্ব। এদের খাদ্যাভ্যাসেও রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। বেশিরভাগ মশাই ফলমূলের রস ও ফুলের মধু খেয়ে বাঁচে। তবে যারা রক্ত খায় তাদের সবাই স্ত্রী মশা।
যেসব মশা রক্ত খায়, তাদের অনেকেই 'জেনারেলিস্ট' বা সর্বভুক। সামনে যা নড়াচড়া করে, তাকেই তারা কামড় বসায়—হোক তা সরীসৃপ, উভচর, পাখি, স্তন্যপায়ী বা শুঁয়োপোকার মতো পোকামাকড়। আর মানুষও এই তালিকার বাইরে নয়। আবার কিছু মশা খাবারের বিষয়ে বেশ খুঁতখুঁতে। 'কিউলিজেটা মেলানুরা' প্রজাতির মশা শুধু ডালে বসা পাখিদেরই রক্ত খায়।
তবে কিছু মশা আছে যারা শুধু মানুষের রক্তই পান করে। যেমন, 'এডিস ইজিপ্টি'। নাম ও আফ্রিকান আদি নিবাস থাকা সত্ত্বেও এরা এখন সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে।
পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানো লোমশ সব প্রাণীর ভিড়ে মশা ঠিক কখন মানুষের উপস্থিতি টের পেল এবং আমাদের লোমহীন চামড়ায় কামড় বসানোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠল, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই প্রবণতাটি ৭০ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়নি। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারের 'সায়েন্টিফিক রিপোর্টস' জার্নালে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এর শুরুটা হয়েছিল প্রায় ১৮ লাখ বছর আগে। সে সময় 'হোমিনিন' বা আদিম মানুষরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুন্দাল্যান্ড অঞ্চলে এসে থিতু হয়েছিল।
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাসনা শ্যামসুন্দর সিং এবং তার সহকর্মীদের মতে, 'অ্যানোফিলিস লিউকোসফাইরাস' গোষ্ঠীর একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মশা আগে বানরের রক্ত খেত। পরে তারা এই আদিম হোমিনিনদের রক্তের স্বাদ পায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই প্রজাতিটি থেকেই মানুষের রক্ত পছন্দ করা সব মশার উৎপত্তি হয়েছে।
গবেষক দলটি 'অ্যানোফিলিস লিউকোসফাইরাস' গোষ্ঠীর ১১টি প্রজাতির ৪০টি মশার (যাদের কেউ মানুষের রক্ত পছন্দ করে, কেউবা মানুষ ছাড়া অন্য প্রাইমেটদের) ওপর জিনগত বিশ্লেষণ চালিয়েছে। এই বিশ্লেষণ একটি নতুন তত্ত্বকে সমর্থন করে। আর তা হলো, হোমিনিনরা অন্তত ১৮ লাখ বছর আগেই এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
গবেষকরা বলছেন, হোমিনিনদের রক্ত টিকটিকি বা বানরের চেয়ে বেশি সুস্বাদু বা পুষ্টিকর ছিল, বিষয়টি এমন নয়। বরং হোমিনিনরা এখানে আসার পর মশার জন্য তারা নতুন একটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং মশা তাদের নিশানা বানায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রক্রিয়াই একটি বিশেষ খাদ্যাভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
আফ্রিকান মশারা হয়তো আজ থেকে প্রায় ৭০ লাখ বছর আগে থেকেই সেই মহাদেশে ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য হোমিনিনদের রক্ত খেয়ে বেশ ভালোই ছিল। তবে নতুন এই গবেষণাপত্রটিতে মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর নজর দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রায় ১৮ লাখ বছর আগে হোমিনিনরা, সম্ভবত সাহসী 'হোমো ইরেক্টাস'রা এই অঞ্চলে পৌঁছেছিল এবং মশাদের নজরে পড়েছিল।
নবাগতদের রক্তে ভোজ
ধারণা করা হয়, জুরাসিক যুগে (২০ কোটি ১০ লাখ থেকে ১৪ কোটি ৩০ লাখ বছর আগে) মশার উৎপত্তি হয়েছিল। জুরাসিক যুগ যখন শুরু হয়, তখন পৃথিবীতে মূলত মহাসাগর এবং 'প্যানজিয়া' নামের একটি বিশাল মহামহাদেশ ছিল। পরে এই প্যানজিয়া ভেঙে উত্তরে লরেশিয়া এবং দক্ষিণে গন্ডোয়ানাল্যান্ড তৈরি হয়।
জুরাসিক যুগের কোনো এক পর্যায়ে যদি রক্তখেকো মশার আবির্ভাব হয়েও থাকে, তবে তারা আজকের দিনের মতোই তখনকার সরীসৃপ, পাখি, স্তন্যপায়ী ও অন্যান্য প্রাণীদের প্রাচীন রূপগুলোর ওপরই নির্ভর করত।
এই পোকামাকড়ের সবচেয়ে পুরোনো যে বাস্তব জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, তা হলো প্রায় ১৩ কোটি বছর আগের লেবাননের অ্যাম্বারে (গাছের জমে যাওয়া আঠালো রস) আটকে থাকা দুটি নমুনা। এই জীবাশ্মগুলো বিজ্ঞানীদের রীতিমতো চমকে দিয়েছিল, কারণ এরা ছিল রক্তখেকো পুরুষ মশা। এদের শরীরে পুরুষালি বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি রক্ত চোষার জন্য সুন্দরভাবে সংরক্ষিত শুঁড় বা 'প্রোবোসিস' ছিল।
বর্তমানে কেবল নিষিক্ত স্ত্রী মশারাই রক্ত পান করে। ডিম পাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় আয়রন এবং প্রোটিন পেতেই তাদের এই রক্তের প্রয়োজন হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক কীটতত্ত্ববিদদের ধারণা ছিল, ফুলের মধু চোষার অভ্যাস থেকে বিবর্তিত হয়েই মশার রক্ত খাওয়ার এই অভ্যাস তৈরি হয়েছে। কিন্তু লেবাননের ওই জীবাশ্ম প্রমাণ করে যে, ১৩ কোটি বছর আগেও পুরুষ মশা রক্ত খেত। এ বিষয়ে চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস-এর জীবাশ্মবিদ দানি আজার রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, এই আবিষ্কার থেকে বোঝা যায়, আদতে সব মশাই ছিল রক্তখেকো।
হোমিনিনদের বিবর্তনের সময়কালে মশা বেশ পুরোনো এক প্রাণী হয়ে ওঠে এবং এদের মধ্যে বৈচিত্র্য দেখা দেয়। এদের বেশিরভাগই ফলমূল খেতে শুরু করে, আর কিছু প্রজাতি হয় রক্তখেকো। এক পর্যায়ে এমন একটি নির্দিষ্ট অভ্যাস তৈরি হয় যেখানে কিছু মশা শুধু 'হোমো' বা মানব প্রজাতির রক্তের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। গবেষক দলটির মতে, এই ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮ লাখ বছর আগে সুন্দাল্যান্ডে।
এই আবিষ্কারটি এশিয়ায় আদিম হোমিনিনদের আগমনের বিষয়টিও সমর্থন করে। বর্তমান মানব প্রজাতির উদ্ভব হওয়ার আগেই মানবজাতির ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি এখন গবেষণায় এক আলোচিত বিষয়। চীনে পাওয়া হোমো ইরেক্টাসের খুলিগুলোকে আগে ১০ লাখ বছর পুরোনো বলে ভাবা হতো, তবে সম্প্রতি পুনরায় এর বয়স নির্ধারণ করে দেখা গেছে এগুলো ১৮ লাখ বছরের পুরোনো। এর মানে হলো, হোমিনিনরা সম্ভবত ২০ লাখ বছর আগে আফ্রিকা থেকে ইউরেশিয়ায় পৌঁছেছিল এবং মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। মধ্য চীনে পাওয়া খুলির ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, ১৮ লাখ বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের পৌঁছানোর বিষয়টি বেশ যৌক্তিক।
উপাসনা সিং, ক্যাথরিন ওয়ালটন এবং তাঁদের দল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ১৯৯২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সংগৃহীত 'লিউকোসফাইরাস' গোষ্ঠীর ১১টি প্রজাতির ৩৮টি মশার ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করেছেন। এরপর তাঁরা ডিএনএ মিউটেশনের হারের হিসাবসহ স্বীকৃত নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে এই মশাদের বিবর্তনের ইতিহাস পুনর্গঠন করেছেন।
গবেষকদের মতে, 'লিউকোসফাইরাস' গোষ্ঠীতে মানব প্রজাতির প্রতি আকর্ষণের এই জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশনটি ২৯ লাখ থেকে ১৬ লাখ বছর আগে সুন্দাল্যান্ডে ঘটেছিল। এর আগে তাদের পূর্বপুরুষরা বানরের রক্ত খেত।
মশার এই 'অ্যানথ্রোপোফিলিক' বা মানুষের রক্ত খাওয়ার অভ্যাস আধুনিক মানুষের সাথে শুরু হয়নি। গবেষক দলটি দাবি করছে, ১৮ লাখ বছর আগে পূর্ব এশিয়ায় হোমো ইরেক্টাসের উপস্থিতি এবং লিউকোসফাইরাস মশাদের হোমিনিন রক্তের প্রতি আসক্তি—এই দুই ঘটনার মধ্যে একটি স্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। আধুনিক মানুষ আজ থেকে প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছায়। তাই কোনোভাবেই আধুনিক মানুষ এই পোকামাকড়ের প্রথম 'মানব ভোজ' হতে পারে না।
আফ্রিকায় যদিও অনেক আগে থেকেই মশা এবং হোমিনিনদের বাস ছিল, তবে গবেষক দল উল্লেখ করেছেন যে, আগে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী আফ্রিকান ম্যালেরিয়া বাহক মশা 'অ্যানোফিলিস গাম্বিয়া' এবং 'অ্যানোফিলিস কলুজি' মানুষের রক্তের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে মাত্র ৬০ হাজার বছর আগে।
পরিবেশগত শূন্যস্থান বা 'নিশ' তৈরি হওয়া জীববিজ্ঞানের একটি পরিচিত বিষয়। গবেষকদের প্রস্তাবনা হলো, লিউকোসফাইরাস মশার মধ্যে মানুষের গন্ধের প্রতি আসক্তি তৈরির জন্য সম্ভবত ১৮ লাখ বছর আগে সুন্দাল্যান্ডে বিপুল সংখ্যক হোমো ইরেক্টাসের উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল।
এরপর, যখন মানবপ্রেমী এই মশার প্রজাতিটি হোমো ইরেক্টাসের শিরায় কামড় বসাতে শুরু করে, তখন তা থেকে আমাদের রক্ত পছন্দ করা আরও অনেক প্রজাতির মশার জন্ম হয়। এর মধ্যে ম্যালেরিয়া ও জিকার মতো ভয়াবহ রোগ ছড়ানো মশাও রয়েছে।
