আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি: কেন যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার কেন্দ্রবিন্দুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যৌথ হামলা চালিয়েছে। এর ফলে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনা আবারও বন্ধ হয়ে গেল। এই অবস্থায়, ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর পাশাপাশি শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কাও তীব্র হয়েছে।
আজ শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) তেহরানের একাধিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে কিছু স্থাপনা এমনও ছিল যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করেছেন। এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা।
ওয়াশিংটন ও তেলআবিব ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব কাঠামোকে 'শিরচ্ছেদ' বা নেতৃত্বশূন্য করার কৌশল নিচ্ছে, এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে তেমন ধারণাও তৈরি হয়েছে।
খামেনি কোথায় অবস্থান করছেন?
তার বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট নয়। বার্তাসংস্থা রয়টার্স অবশ্য একটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, খামেনি তেহরানে নেই; তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
খামেনি কে?
৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি। খোমেনি নির্বাসন থেকে ফিরে এসে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন, যা যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনের অবসান ঘটায়।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি ইরানের নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখেন। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কও তিনি। পাশাপাশি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও পালন করেন।
তার নেতৃত্বকালে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা, কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নাগরিক অধিকার ইস্যুতে একাধিক অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েছে।
খামেনি বহুবার যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের "এক নম্বর শত্রু" হিসেবে উল্লেখ করেছেন; এরপরেই ইসরায়েলের নাম উচ্চারণ করেছেন।
তার ক্ষমতার ভিত্তি ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংস্থার তাঁর প্রতি আনুগত্য, এগুলো হলো—ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাসিজ মিলিশিয়া বাহিনী, যেখানে লাখ লাখ স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে।
খামেনি বরাবরই দাবি করে আসছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে না; তাদের কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে রয়েছে—এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পায়নি। তবে ইসরায়েল এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এর উল্টোটাই দাবি করে আসছেন।
খামেনি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কী বলেছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এর আগেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়ে কঠোর ও হুমকিসূচক বক্তব্য দিয়েছেন।
জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ১২ দিনের সংঘাতের পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরেল কাৎজ বলেন, খামেনি "টিকে থাকতে পারেন না"।
তার ভাষায়, "খামেনির মতো একজন স্বৈরশাসক, যিনি ইসরায়েল ধ্বংসের ভয়াবহ লক্ষ্য সামনে রেখে ইরানের মতো একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁর অস্তিত্ব থাকতে পারে না।"
একই মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দেন, খামেনিকে হত্যার চেষ্টা করার সম্ভাবনা ইসরায়েল পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়নি। তার মতে, এমন পদক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-ও ইরানি নেতাকে ঘিরে মন্তব্য করেছেন, যা অনেকেই সরাসরি হুমকি হিসেবেই মনে করছেন।
সম্প্রতি এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন এই অঞ্চলে সামরিক সম্পদ মোতায়েন করছে, তখন খামেনির "খুব উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত"।
আরেক বক্তব্যে তিনি ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনকে "সর্বোত্তম ঘটনা" বলে আখ্যা দেন এবং তাঁর জায়গায় ইরানের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারে—এমন "কিছু লোক" রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। যদিও এনিয়ে বিস্তারিত কিছু তিনি বলেননি।
গত বছর ইরানে হামলার নির্দেশ দেওয়ার সময়ও ট্রাম্প খামেনিকে "সহজ লক্ষ্যবস্তু" বলে উল্লেখ করেছিলেন।
তার ভাষায়, "আমরা ঠিক জানি তথাকথিত 'সর্বোচ্চ নেতা' কোথায় লুকিয়ে আছেন। তিনি সহজ লক্ষ্যবস্তু, কিন্তু আপাতত নিরাপদে আছেন—আমরা তাকে সরিয়ে (হত্যা) দিচ্ছি না , অন্তত এখনই নয়।"
