যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরমাণু চুক্তিতে আবারও সমঝোতাকারীর ভূমিকায় ফিরতে চান আব্বাস আরাগচি
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মনে করেন, তার দেশের কূটনৈতিক আলোচনার ধরন অনেকটা বাজারের কেনাবেচার মতো, যার জন্য প্রয়োজন 'ধৈর্য ও দীর্ঘ সময়'। কিন্তু সময় হয়তো এখন তার পক্ষে নেই।
কয়েক দশকের অভিজ্ঞ কূটনীতিক হিসেবে আরাগচি এখন সবচেয়ে কঠিন আলোচনার মুখোমুখি। লক্ষ্য একটাই—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির মুখে সামরিক হামলা এড়াতে একটি পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছানো।
২০২৪ সাল থেকে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আরাগচি ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর পূর্ণ আস্থা রয়েছে আরাগচির ওপর। তাকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মাত্র আট মাস আগে মার্কিন বাহিনী ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। এখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তির মহড়ার মধ্যে তেহরান আরাগচির বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের ওপর ভরসা রাখছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত তার বই 'দ্য পাওয়ার অফ নেগোসিয়েশন'-এ আরাগচি লিখেছেন, ইরানিদের আলোচনার ধরন সাধারণত 'বাজার শৈলী' নামে পরিচিত, যার মানে হলো 'নিরবিচ্ছিন্ন ও ধৈর্যশীল দরকষাকষি'। সেখানে তিনি তার মায়ের দরকষাকষির দক্ষতার স্মৃতিও তুলে ধরেছেন। তবে অতি দরকষাকষি সম্পর্কে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন। তার মতে, 'সূর্যের নিচে যখন আপনি বরফ বিক্রি করছেন, তখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দরকষাকষি মানেই লোকসান।'
সামরিক শক্তি চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না
এক দশকেরও বেশি সময় আগে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় কঠিন দরকষাকষিতে আরাগচি নিজের সুনাম তৈরি করেন। সেই আলোচনায় অংশ নেওয়া পশ্চিমা কূটনীতিকরা তাকে অত্যন্ত গম্ভীর, প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ ও স্পষ্টভাষী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গত বছর মার্কিন হামলার আগে ব্যর্থ আলোচনায় তিনি ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
নম্র স্বভাবের আরাগচি কিশোর বয়সে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে যোগ দেন এবং ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন। দীর্ঘ সময় তাকে চেনা একজন ব্যক্তি তাকে শান্ত ও ধৈর্যশীল, একই সঙ্গে লড়াকু ও সহনশীল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রোববার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন উভয় পক্ষের 'উইন-উইন' (দুই পক্ষেরই লাভ) কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ এখনও আছে। তিনি বলেন, 'সামরিক শক্তি প্রদর্শনের কোনো প্রয়োজন নেই।'
তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই ধরনের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে চাপ দেওয়া সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। গত মঙ্গলবার এক ভাষণে তিনি বলেন, ইরান চুক্তি করতে চায়, কিন্তু তিনি এখনও তাদের মুখ থেকে সেই গোপন কথাটি শুনতে পাননি যে, 'আমরা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করব না'। তবে ইরান সব সময়ই দাবি করে আসছে যে তারা পারমাণবিক বোমা চায় না।
২০২১–২৫ মেয়াদে বাইডেন প্রশাসনের সময় ২০১৫ সালের চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা ছিল আরাগচির নেতৃত্বে। পরে তার জায়গায় একজন কট্টরপন্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর তিনি খামেনীয়র উপদেষ্টা পরিষদের সচিব হন, যা তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
১৯৬২ সালে তেহরানের এক ধনী ধর্মীয় বণিক পরিবারে জন্ম নেওয়া আরাগচির বয়স যখন ১৭, তখন ইরানে ইসলামি বিপ্লব শুরু হয়। শাহ আমলের পতনে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে (আইআরজিসি) যোগ দেন এবং ১৯৮০–৮৮ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন।
১৯৮৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার পর তিনি ফিনল্যান্ড ও জাপানে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এবং পরে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। তিনি ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অফ কেন্ট থেকে রাজনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
ধর্মপ্রাণ মুসলিম আরাগচি কট্টরপন্থী থেকে বাস্তববাদী—সব ধরনের প্রেসিডেন্টের অধীনেই কাজ করেছেন। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ হলেও আরাগচি নিজেকে দলাদলি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াই থেকে দূরে রেখেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, 'সর্বোচ্চ নেতা, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং ইরানের সব রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে।'
