সন্তান আত্মহত্যা–সংক্রান্ত কনটেন্ট খুঁজলে অভিভাবকদের সতর্ক করবে ইনস্টাগ্রাম
সন্তানেরা ইনস্টাগ্রামে আত্মহত্যা বা নিজের ক্ষতি করা সম্পর্কিত কিছু খুঁজছে কি না, তা এখন থেকে জানতে পারবেন অভিভাবকেরা। সন্তান যদি বারবার এ ধরনের ক্ষতিকর বিষয়বস্তু বা কনটেন্ট খোঁজে, তবে ইনস্টাগ্রাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিভাবকদের কাছে সতর্কবার্তা বা অ্যালার্ট পাঠাবে।
মেটা জানিয়েছে, তাদের 'প্যারেন্টাল সুপারভিশন' টুলের আওতায় এই সুবিধা যুক্ত হচ্ছে। এর আগে কেউ ক্ষতিকর কিছু খুঁজলে ইনস্টাগ্রাম সাধারণত তা ব্লক করত বা ব্যবহারকারীকে হেল্পলাইনে যোগাযোগের পরামর্শ দিত।
কিন্তু এই প্রথম মেটা অভিভাবকদের সতর্ক করার উদ্যোগ নিল। আগামী সপ্তাহ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় ইনস্টাগ্রামের 'টিন অ্যাকাউন্টস'-এর জন্য এই ফিচার চালু হবে। পরে পর্যায়ক্রমে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এটি উন্মুক্ত করা হবে।
তবে মেটার এই নতুন উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করা দাতব্য সংস্থা 'মলি রোজ ফাউন্ডেশন'। তাদের আশঙ্কা, এই পদক্ষেপ উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করতে পারে।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি বারোজ বলেন, 'মেটার এই ঘোষণা বেশ অপরিপক্ব ও ঝুঁকিপূর্ণ। জোর করে গোপন তথ্য ফাঁস করা অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, 'সব বাবা-মাই জানতে চান তাঁর সন্তান কোনো সংকটে আছে কি না। কিন্তু আচমকা এমন নোটিফিকেশন অভিভাবকদের আতঙ্কিত করে তুলতে পারে। তখন সন্তানের সঙ্গে এমন স্পর্শকাতর ও কঠিন বিষয়ে কথা বলার মতো মানসিক প্রস্তুতি তাঁদের না–ও থাকতে পারে।'
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ১৪ বছর বয়সী মলি রাসেল ইনস্টাগ্রামে আত্মহত্যা ও নিজেকে আঘাত করার মতো কনটেন্ট দেখে নিজের প্রাণ নিয়েছিল। তার মৃত্যুর পরই পরিবারের উদ্যোগে এই ফাউন্ডেশনটি গড়ে তোলা হয়।
মেটা অবশ্য বলছে, সন্তান অল্প সময়ের মধ্যে বারবার আত্মহত্যার কনটেন্ট খুঁজলে অভিভাবকদের সতর্ক করার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ পরামর্শও দেওয়া হবে। যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন, ওই মুহূর্তে সন্তানের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে।
তবে মলির বাবা ও ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান রাসেল এতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'ভাবুন তো, কোনো বাবা বা মা অফিসে কাজের ফাঁকে হঠাৎ মেসেজ পেলেন যে তাঁর সন্তান জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবছে... ওই মুহূর্তে আমি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতাম, জানি না।'
ইয়ান রাসেল মনে করেন, ওই আতঙ্কের মুহূর্তে মেটার দেওয়া পরামর্শ বা গাইডলাইন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বা বুদ্ধিদীপ্ত কোনো সমাধান নয়।
মেটার এই নতুন পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ বলছেন, ইনস্টাগ্রাম শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে এখনো যথেষ্ট কাজ করছে না।
তরুণদের আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে কাজ করা ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা 'প্যাপিরাস'-এর প্রধান নির্বাহী গেড ফ্লিন বলেন, 'শিশুরা যে অন্ধকার ও বিপজ্জনক অনলাইন জগতে তলিয়ে যাচ্ছে, সেই মূল সমস্যাটিই মেটা এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা আমাদের ফোন করে জানান, তাঁরা সন্তানের অনলাইন আসক্তি নিয়ে কতটা চিন্তিত।'
তিনি আরও বলেন, 'অভিভাবকেরা চান না, ক্ষতিকর কনটেন্ট খোঁজার পর তাদের সতর্ক করা হোক। বরং তাঁরা চান, অ্যালগোরিদম যেন বুঝেশুনে কাজ করে এবং শিশুদের সামনে ক্ষতিকর বিষয়বস্তু তুলে না ধরে।'
মলি রোজ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি বারোজ অভিযোগ করেন, ইনস্টাগ্রাম এখনো 'বিষণ্নতা, আত্মহত্যা ও নিজেকে আঘাত করার মতো ক্ষতিকর কনটেন্ট' ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের সামনে তুলে ধরছে। তিনি বলেন, 'দায়িত্ব তাদেরই নেওয়া উচিত। কিন্তু মেটা সুকৌশলে দায়টা অভিভাবকদের কাঁধেই চাপিয়ে দিচ্ছে।'
অবশ্য মেটা গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ওই গবেষণার ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, শিশুদের সুরক্ষা ও অভিভাবকদের ক্ষমতায়নে তাদের প্রচেষ্টাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
মেটা জানিয়েছে, অভিভাবকদের কাছে ই-মেইল, এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমেই এই সতর্কবার্তা পাঠানো হবে। তবে ব্যবহারকারীর সার্চ প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে মাঝেমধ্যে ভুল সতর্কবার্তাও চলে যেতে পারে। মেটা বলছে, 'সতর্ক থাকার স্বার্থে' তারা একটু বেশি সাবধানতা অবলম্বন করবে।
ইনস্টাগ্রাম জানিয়েছে, আগামী মাসগুলোতে তাদের এআই চ্যাটবটের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হবে। কিশোর-কিশোরীরা এখন চ্যাটবটের সঙ্গেও নিজেদের মানসিক অবস্থা নিয়ে কথা বলছে। সেখানে যদি আত্মহ্ত্যা বা নিজেকে আঘাত করার মতো বিষয় উঠে আসে, তবে একইভাবে অভিভাবকদের সতর্ক করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে বিশ্বজুড়ে সরকারের চাপ বাড়ছে। বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করেছে। স্পেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও একই পথে হাঁটার কথা ভাবছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইনপ্রণেতারাও এখন বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কৌশল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গ ও ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরিকে হাজিরা দিতে হয়েছে। সেখানে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবেই অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন।
