প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বড় উত্থান, বৈশ্বিক মোটের ২১ শতাংশই এখন ইউরোপের দখলে: আইআইএসএসের প্রতিবেদন
ইউরোপে প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি ইউরোপের দেশগুলো করেছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর নতুন প্রতিবেদনে।
আইআইএসএসের ডিফেন্স অ্যান্ড মিলিটারি অ্যানালাইসিস বিভাগের পরিচালক বাস্টিয়ান গিগেরিশ বার্ষিক সামরিক ব্যয় প্রতিবেদন প্রকাশকালে বলেন, "আইআইএসএস বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ২১ শতাংশেরও বেশি এসেছে ইউরোপ থেকে, যেখানে ২০২২ সালে এ হার ছিল ১৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে ইউরোপে প্রকৃত মূল্যে প্রায় ১৩ শতাংশ সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ২০২৫ সালে এ বৃদ্ধির এক-চতুর্থাংশ করেছে জার্মানি, যা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী হিসেবে দেশটির অবস্থান সুসংহত করেছে।"
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০২৪ সালের ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
গবেষণা সংস্থাটি জানায়, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের চতুর্থ বার্ষিকীতে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, এগুলো হচ্ছে "রুশ আগ্রাসনের জবাব" এবং ইউরোপের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কমে যাওয়ার প্রবণতা।
বার্লিন প্রসঙ্গে বাস্টিয়ান বলেন, "২০২৫ সালে জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে ১০৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৮৬ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্য দেশগুলো গড়ে জিডিপির ২ দশমিক ১৬ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করেছে।"
তিনি আরও বলেন, ইউরোপে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের আরও প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে রাজনৈতিক ও জনসমর্থন অব্যাহত থাকার ওপর, বিশেষত যখন অনেক দেশই উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপে রয়েছে।
গত বছর ন্যাটো সদস্য দেশগুলো জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয়ের অঙ্গীকার করে, যার মধ্যে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ "মূল" প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় এবং ১ দশমিক ৫ শতাংশ জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সক্ষমতায় ব্যয় করার কথা বলা হয়। বাস্টিয়ান বলেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা কিছু মিত্রদেশের পক্ষে ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মূল প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় ব্যয়ের নতুন লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে। তবে জার্মানি, যে দেশটি ২০২৪ সাল পর্যন্ত জিডিপির ২ শতাংশের কম প্রতিরক্ষায় ব্যয় করত, ইতোমধ্যে ২০২৯ সালের মধ্যেই নতুন লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
আইআইএসএসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আগের বছরের ৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেশি। তবে প্রকৃত মূল্যে রাশিয়ার সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ, যেখানে ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ। বাস্টিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সংস্কার ও দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক পদক্ষেপের প্রভাবেই হয়তো এই ধীরগতি দেখা গেছে।
প্রতিবেদনটি ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমানায় ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের প্রচেষ্টাও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ঘোষিত "বাল্টিক ড্রোন ওয়াল" কর্মসূচির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা মধ্যপ্রাচ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ অঞ্চলে এখনও সৌদি আরব সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী এবং বৈশ্বিকভাবে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে।
বাস্টিয়ান জানান, "সৌদি আরব ৭২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজেট নিয়ে অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় ব্যয়কারী থাকলেও— গত বছর মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয়ে প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস ছিল ইসরায়েল ও আলজেরিয়া। ২০২৫ সালে আলজেরিয়া জিডিপির ৮ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করেছে—যা ইউক্রেনের পর বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যয় বেড়ে জিডিপির ৬ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; যা ২০২৪ সালে ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, এবং ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের হামলার আগের পাঁচ বছরে গড় ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ।"
তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলের দেশগুলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি বৃদ্ধি ও উৎপাদন সক্ষমতা জোরদারে পদক্ষেপ নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ১৩ শতাংশ প্রতিরক্ষা রপ্তানি আয় বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা কংগ্লোমারেট– সৌদি এরাবিয়ান মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিজ (সামি) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের এজ গ্রুপ একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ ও যৌথ উদ্যোগ কার্যক্রম জোরদার করেছে। যার লক্ষ্য তাদের সক্ষমতা বাড়ানো ও উৎপাদিত পণ্যের পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ।
প্রতিবেদনটিতে গত এক দশকে চীনের প্রতিরক্ষা বাজেটে "নিয়মিত বাড়া"র কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা এশিয়া অঞ্চলের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আঞ্চলিক গড়ে যেখানে চীনের অংশ ছিল ৩৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
