ইউরোপে মাত্র ৬ সপ্তাহের জেট ফুয়েল অবশিষ্ট আছে: আইইএ প্রধান
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল সতর্ক করে বলেছেন যে, ইউরোপের হাতে আর মাত্র ছয় সপ্তাহের মতো জেট ফুয়েল [বিমানের জ্বালানি] অবশিষ্ট আছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকলে শীঘ্রই অনেক ফ্লাইট বাতিল হতে পারে।
বিরল বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, যার প্রভাব সারা বিশ্বে অনুভূত হবে।
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'পরিস্থিতি এখন সত্যিই সংকটাপন্ন। বিশ্ব অর্থনীতিতে এর গভীর প্রভাব পড়বে। এই অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হবে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির জন্য তা তত বেশি ক্ষতিকর হবে।'
তিনি আরও জানান, এই সংকটের সরাসরি প্রভাব হিসেবে পেট্রোল, গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম আরও বৃদ্ধি পাবে।
আইইএ জানিয়েছে, ইউরোপ আগে তাদের জেট ফুয়েল আমদানির প্রায় ৭৫ শতাংশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে ইউরোপীয় দেশগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহ প্রতিস্থাপনের জন্য অন্যান্য উৎস থেকে আমদানির আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন এই বিকল্প সরবরাহ আসছে যুক্তরাষ্ট্র এবং নাইজেরিয়া থেকে।
আইইএ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন জেট ফুয়েল রপ্তানি দ্রুত ত্বরান্বিত হয়েছে। তবে সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে, এই সব চালান ইউরোপে গেলেও তা ঘাটতির অর্ধেকের কিছু বেশি পূরণ করতে পারবে।
বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আইইএ বলেছে, ইউরোপ যদি মধ্যপ্রাচ্যের আমদানির ৫০ শতাংশের বেশি প্রতিস্থাপন করতে না পারে, তবে 'নির্বাচিত কিছু বিমানবন্দরে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে, যার ফলে ফ্লাইট বাতিল এবং চাহিদা হ্রাসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে'।
যদি সরবরাহের তিন-চতুর্থাংশ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়, তবুও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তবে তা আগস্টের আগে নয়।
আইইএ-র মতে, 'গ্রীষ্মের মাসগুলোতে পর্যাপ্ত মজুত বজায় রাখতে চাইলে ইউরোপীয় বাজারগুলোকে অন্যান্য উৎস থেকে বিকল্প পণ্য আমদানির জন্য আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে'।
আর্গাস মিডিয়ার ইউরোপীয় জেট ফুয়েল মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান আম্মার খান মনে করেন, অদূর ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ শুরু হলেও গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের ব্যস্ত মৌসুমের আগে ঘাটতি থেকেই যেতে পারে।
তিনি বলেন, 'এটি নিশ্চিত নয়, তবে ইউরোপের কিছু এলাকায় জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে। অবশ্যই হিথ্রোর মতো বড় বিমানবন্দরগুলো ছোট বিমানবন্দর বা কম চাহিদাসম্পন্ন হাবগুলোর তুলনায় অগ্রাধিকার পাবে। তবে হ্যাঁ, সরবরাহ শুরু হলেও তা মহাদেশটিতে পৌঁছাতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগবে'।
জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় বিশ্বের অনেক বিমান সংস্থাকে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। সাধারণত একটি এয়ারলাইন্সের মোট পরিচালন ব্যয়ের ২০ থেকে ৪০ শতাংশই ব্যয় হয় জ্বালানির পেছনে।
এপ্রিলের শুরুতে ইউরোপীয় জেট ফুয়েলের বেঞ্চমার্ক মূল্য প্রতি টনে ১,৮৩৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল মাত্র ৮৩১ ডলার। অর্থাৎ দাম এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বর্তমানে 'জ্বালানি সংকটের কোনো প্রমাণ নেই।' তবে তারা স্বীকার করেছে, 'অদূর ভবিষ্যতে' সরবরাহ সমস্যা দেখা দিতে পারে
এক সংবাদ সম্মেলনে একজন মুখপাত্র জানান, ইইউ শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ 'স্থিতিশীল রয়েছে এবং বর্তমানে অতিরিক্ত মজুত ছাড়ার প্রয়োজন নেই'।
কমিশন জানিয়েছে, তেল ও গ্যাস সমন্বয়কারী দলগুলো প্রতি সপ্তাহে বৈঠক করছে এবং আগামী সপ্তাহে জ্বালানি সংক্রান্ত নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করবেন কমিশনের প্রেসিডেন্ট।
গত সপ্তাহে ইউরোপীয় বিমানবন্দরগুলোর বাণিজ্য সংগঠন এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল কমিশনকে চিঠি লিখে সতর্ক করেছে, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে না দেওয়া হলে মহাদেশটিতে জেট ফুয়েলের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
এদিকে শিল্প গোষ্ঠী এয়ারলাইন্স ফর ইউরোপ ইইউ-কে যাত্রী ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত নিয়মগুলো স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা চায় জ্বালানি সংকট বা আকাশপথ বন্ধ হওয়ার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে যেন 'অস্বাভাবিক পরিস্থিতি' হিসেবে গণ্য করা হয়। এর অর্থ হলো, এ কারণে ফ্লাইট বাতিল হলে এয়ারলাইন্সগুলোকে যাত্রীদের বড় অংকের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।
বৃহস্পতিবার এক ব্যবসায়িক আপডেটে ইজিজেট জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে মার্চ মাসে তাদের ২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয়েছে। অথচ এই বিমান সংস্থাটি বর্তমান খরচ বাড়ার আগেই তাদের তিন-চতুর্থাংশ জেট ফুয়েল একটি নির্দিষ্ট দামে আগাম নিশ্চিত করেছিল।
তারা জানিয়েছে, এই সংঘাতের ফলে 'জ্বালানি খরচ এবং গ্রাহকের চাহিদাকে কেন্দ্র করে নিকট-মেয়াদী অনিশ্চয়তা' তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ডাচ এয়ারলাইন কেএলএম জানিয়েছে, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে তারা আগামী মাসে ইউরোপে ১৬০টি ফ্লাইট বাতিল করবে।
তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, এটি তাদের মোট ইউরোপীয় ফ্লাইটের ১ শতাংশের কম এবং তারা এখনো বড় ধরণের কোনো জেট ফুয়েল সংকটের মুখে পড়েনি।
