প্রতিরক্ষা নিয়ে ট্রাম্পের বার্তা বুঝতে পেরেছেন ইউরোপের নেতারা: ন্যাটো মহাসচিব
জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর ন্যাটোর মহাসচিব জেনারেল মার্ক রুটে বলেছেন, ইউরোপীয় নেতারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বার্তা 'পেয়ে গেছেন'।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে ন্যাটো মিত্ররা যথাযথ সহযোগিতা করছে না—এমন অভিযোগে ট্রাম্প তাদের প্রতি ক্রমশ অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছিলেন। সোমবার রুটে কথা বলার সময় মার্কিন পক্ষের এই 'হতাশার' বিষয়টি স্বীকার করে নেন।
এদিন তিনি আর্মেনিয়ায় ইউরোপীয় পলিটিক্যাল কমিউনিটির বৈঠকে অংশ নেওয়ার আগে বলেন, "ইউরোপীয় নেতারা বার্তাটি পেয়েছেন। তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই বার্তা শুনতে পেয়েছেন।"
তিনি আরও যোগ করেন, "(প্রতিরক্ষা নিয়ে) ইউরোপীয়রা এখন আরও সক্রিয় হচ্ছে। ইউরোপের ভূমিকা আরও জোরালো হচ্ছে এবং ন্যাটো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।"
গত শুক্রবার পেন্টাগন জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এর কয়েক দিন আগেই জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস মন্তব্য করেছিলেন যে, যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে 'অপদস্থ' করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস এই সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার সময়কে একটি 'বিস্ময়' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
কালাস বলেন, "আমি মনে করি এটি প্রমাণ করে যে, ন্যাটোতে আমাদের ইউরোপীয় স্তম্ভকে সত্যিই শক্তিশালী করতে হবে এবং আমাদের আরও বেশি কিছু করতে হবে।" তবে তিনি জোর দিয়ে মনে করিয়ে দেন, "মার্কিন সৈন্যরা ইউরোপে কেবল ইউরোপীয় স্বার্থরক্ষার জন্য নয়, বরং আমেরিকান স্বার্থরক্ষার জন্যও (ইউরোপে) অবস্থান করছে।"
গত সপ্তাহান্তে ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট বলেন, ৩২ দেশের এই সামরিক জোটের কর্মকর্তারা "জার্মানিতে মার্কিন বাহিনীর অবস্থানের বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত জানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করছেন।"
'বিপজ্জনক সামরিক হস্তক্ষেপ'
হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল বিঘ্নিত হওয়া ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাবের কারণে ইরান যুদ্ধের ওপর ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা গত কয়েক সপ্তাহে তীব্র হয়েছে।
গত সপ্তাহে জার্মান চ্যান্সেলর মের্ৎস এই যুদ্ধকে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের মতো পূর্ববর্তী সামরিক বিপর্যয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, "বর্তমানে এটি একটি অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি। আর এটি আমাদের বিপুল অর্থের অপচয় ঘটাচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আমাদের অর্থনীতির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।"
এদিকে ন্যাটোভুক্ত স্পেনও তাদের আকাশসীমা বা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানোর অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছে। স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই যুদ্ধকে 'অযৌক্তিক' এবং আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে একটি 'বিপজ্জনক সামরিক হস্তক্ষেপ' অভিহিত করে নিন্দা করেছেন। এর জবাবে ট্রাম্প স্পেনকে 'জঘন্য' বলে অভিহিত করেছেন এবং দেশটির সাথে সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছেন।
তবে এত ঘটনার পরও ন্যাটো মহাসচিব রুটে জানিয়েছেন, 'আরও বেশি সংখ্যক' ইউরোপীয় দেশ এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের কাছাকাছি মাইনহান্টার এবং মাইনসুইপারের মতো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করছে, যাতে যুদ্ধের 'পরবর্তী ধাপের' জন্য প্রস্তুত থাকা যায়।
তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। এর আগে ইউরোপীয় দেশগুলো বারবার জোর দিয়ে বলেছিল যে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি পাহারায় কোনো সহায়তা করবে না।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি
মিত্রদের সাথে ট্রাম্পের ট্রাম্পের টানাপোড়েনের মধ্যে ন্যাটোতে মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের মুখে অনেক ইউরোপীয় দেশ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে—আর্মেনিয়ার রাজধানীতে সমবেত ইইউ নেতারা এই বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, "ইউরোপীয়রা তাদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে, তাদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং নিজস্ব অভিন্ন সমাধান গড়ে তুলছে।"
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন সাংবাদিকদের বলেন, "নিজেদের প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের সামরিক সক্ষমতা অবশ্যই বাড়াতে হবে।"
