মার্কিন অভিযানে সহায়তায় আপত্তি ইউরোপের, ইরান যুদ্ধ ঘিরে ট্রাম্পের দুশ্চিন্তা বাড়ছে
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। এর মধ্যেই ইউরোপের কয়েকটি দেশ মার্কিন সামরিক অভিযানে সহায়তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
গত মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্পেনের পরে এবার ফ্রান্স ও ইতালি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছে।
মাসব্যাপী চলা এই যুদ্ধে সহায়তা করছে না বলে অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকে 'কাপুরুষ' বলে তীব্র আক্রমণ করেছেন। এর মাধ্যমে জোটের ভেতরের ফাটল প্রকাশ্যে উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার তিনি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় সহায়তা না করা দেশগুলোর সমালোচনা করেন।
ফ্রান্সের নাম উল্লেখ করে ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ফ্রান্স নামের দেশটি ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে সামরিক সরঞ্জামবাহী বিমানগুলোকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি। 'ইরানের কসাই'-এর বিষয়ে ফ্রান্স খুবই অসহায় ভূমিকা পালন করেছে, যাকে সফলভাবে নির্মূল করা হয়েছে! যুক্তরাষ্ট্র এটি মনে রাখবে!!!
ফ্রান্সের আপত্তি
একজন পশ্চিমা কূটনীতিক ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুইটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বহনের উদ্দেশ্যে ইসরায়েলকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি ফ্রান্স।
সূত্রগুলো জানায়, অস্ত্রগুলো ইসরায়েলি বিমানে বহন করা হচ্ছিল বলেই তারা এই অনুমতি চেয়েছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে ফ্রান্স। তবে এ বিষয়ে ফরাসি সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুমতি দেয়নি ইতালি
অন্যদিকে মঙ্গলবার সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানকে সিসিলির সিগোনেলা বিমানঘাঁটিতে অবতরণের অনুমতি দেয়নি ইতালি। মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার আগে এসব বিমান সেখানে অবতরণের কথা ছিল।
প্রথম এ খবর প্রকাশকারী গণমাধ্যম ইতালির দৈনিক কোরিয়েরে দেলা সেরা জানায়, 'কিছু মার্কিন বোমারু বিমান' পূর্ব সিসিলির ওই ঘাঁটিতে অবতরণের কথা ছিল, সেখান থেকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।
তবে প্রতিবেদনটিতে কবে বা কখন বিমানগুলো অবতরণ করার কথা ছিল তা উল্লেখ করা হয়নি।
এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় অনুমতি চেয়ে আবেদন করেনি এবং দেশটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের বিষয়ে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী ইতালির সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি বলেই এই অনুমতি দেওয়া হয়নি।
যুদ্ধবিরোধিতায় সবচেয়ে সরব স্পেন
তবে ইরানবিরোধী যুদ্ধে সবচেয়ে সরব অবস্থান নিয়েছে স্পেন। সোমবার দেশটি জানায়, ইরানে হামলায় জড়িত মার্কিন বিমানগুলোর জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার অন্যতম কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
স্পেন কেবল ন্যাটো মিত্রদের 'সম্মিলিত প্রতিরক্ষা'র ক্ষেত্রে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেবে বলে মঙ্গলবার স্পষ্ট করেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিটা রোব্লেস।
তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকেই, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্কিন বিমানগুলোর জন্য স্পেনের আকাশসীমা ব্যবহারে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত টিভিই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেন, সম্ভাব্য কোনো প্রতিশোধ নিয়ে স্পেন উদ্বিগ্ন নয়।
তিনি বলেন, 'আমরা একেবারেই কিছু ভয় করি না। আন্তর্জাতিক আইন, বিশ্বশান্তি এবং জাতিসংঘ সনদ রক্ষার জন্য একটি দেশ কীভাবে ভয় পেতে পারে? যদি আইন মেনে চলা দেশগুলোকেই ভয় পেতে হয়, তাহলে আমরা কেমন বিশ্বে বাস করব?'
ব্রিটেনকে বিশেষ করে সমালোচনা ট্রাম্পের
যুক্তরাজ্যকে বিশেষ করে সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মঙ্গলবার তিনি দেশটিকে 'অসহযোগী' হিসেবে উল্লেখ করেন।
ঠিক একই সময়ে বাকিংহাম প্যালেস জানায়, এপ্রিলের শেষ দিকে রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলা যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফরে যাবেন।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, 'হরমুজ প্রণালীর কারণে যেসব দেশ জ্বালানি সংকটে পড়ছে, যেমন যুক্তরাজ্য, যারা ইরানের নেতৃত্বকে সরানোর অভিযানে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে—তাদের জন্য আমার দুটি পরামর্শ আছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনুন, আমাদের কাছে পর্যাপ্ত আছে। দ্বিতীয়ত, কিছুটা দেরিতে হলেও সাহস অর্জন করুন, প্রণালীতে যান এবং তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিন।'
যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাজ্য—সব দেশই ন্যাটোর সদস্য।
