জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়ায় ভারতের বাণিজ্য ঘাটতিতে বড় উল্লম্ফন
আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায়— ভারতের জ্বালানি আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে গত এপ্রিল মাসে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে।
গত শুক্রবার ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে (এপ্রিল) দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি ২৮.৩৮ বিলিয়ন (২ হাজার ৮৩৮ কোটি) ডলারে পৌঁছেছে। গত মার্চ মাসে এই ঘাটতি ছিল ২০.৬ বিলিয়ন ডলার, যার অর্থ এপ্রিল মাসে বাণিজ্য ব্যবধান এক ধাক্কায় ৮ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা এই ঘাটতি ২৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি থাকার পূর্বাভাস দিলেও – প্রকৃত চিত্র তা ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিলের তুলনায়, গত মাসে ভারতের মোট রপ্তানি ১৩.৮ শতাংশ বেড়ে ৪৩.৫৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে রপ্তানি বাড়লেও আমদানির ব্যয়ও অনেক বেশি বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আড়াই মাস পরও— বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি বেশিরভাগ তেলবাহী ট্যাঙ্কারের জন্য বন্ধ রয়েছে। ফলে ভারতসহ অপরিশোধিত তেলের বড় আমদানিকারক দেশগুলো এই রুটের ওপর নির্ভরশীল নয়—এমন উৎপাদকদের কাছ থেকে চড়া মূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে।
এই ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি এবং আকাশচুম্বী জ্বালানি আমদানির বিল— ভারত সরকারের চলতি হিসাব এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। মূলত তেলের সরবরাহ সংকট ইতিমধ্যেই দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল এই অর্থনীতির তেল আমদানি ব্যয় যেমন আকাশচুম্বী হয়েছে, তেমনি পুঁজিবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও পুঁজি তুলে নিচ্ছেন। পাশাপাশি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মানও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা ভারতে মূল্যস্ফীতির প্রাক্কলন বাড়াতে শুরু করেছেন এবং চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটিতে শুধু অপরিশোধিত তেল সরবরাহেই বিঘ্ন ঘটছে না; পাশাপাশি এলএনজি এবং রান্নার প্রধান জ্বালানি এলপিজি-র সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায়—পুরো অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের 'অয়েল শক' বা জ্বালানি ধাক্কা অনুভূত হতে শুরু করেছে।
যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট এই ধাক্কা ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দেবে। আন্তর্জাতিক আর্থিকখাতের বিশ্লেষক সংস্থা- ফিচ গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিএমআই আশঙ্কা করছে, এই তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৬.৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে; যা বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল ৭.৭ শতাংশ।
