নেপালের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ‘র্যাপার’ বালেন শাহ
গত সেপ্টেম্বরের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর নেপালে আমূল পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। সেই আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এখন আগামী ৫ মার্চের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী এক সময়ের র্যাপার ও কাঠমান্ডুর বর্তমান মেয়র বালেন্দ্র শাহ—যিনি দেশজুড়ে 'বালেন' নামেই বেশি পরিচিত।
২০২৪ সালের সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। ওলি পদত্যাগ করার পর বালেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার লাখো অনুসারীর উদ্দেশে লিখেছিলেন, 'প্রিয় জেনারেশন জেড, তোমাদের হত্যাকারীর পদত্যাগ এসেছে। এখন তোমাদের প্রজন্মকেই দেশ পরিচালনা করতে হবে। প্রস্তুত হও।'
মেয়র হিসেবে দুই বছরের অভিজ্ঞতা পুঁজি করে বালেন এখন দেশের শীর্ষ পদের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার। যদিও নেপালে কোনো নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ নেই, তবে চারজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দের তালিকায় সবার চেয়ে এগিয়ে রাখছে।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ বিপিন অধিকারী বলেন, 'বালেন শাহ এতটাই জনপ্রিয় যে এখন কাঠমান্ডুগামী বাসগুলোতে স্টিকার লাগানো থাকে—বালেনের শহরে যাত্রা।'
নেপালের রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি দলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর মধ্যে ওলি-র কমিউনিস্ট পার্টি চীনঘেঁষা এবং নেপালি কংগ্রেস ভারতঘেঁষা হিসেবে পরিচিত। বালেন শাহর দল 'রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি' (আরএসপি) একটি মধ্যপন্থী নতুন শক্তি। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বড় দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে 'ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক' বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
মেয়র হিসেবে কাঠমান্ডুর অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে বালেন শাহ ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বেশ কিছু সংস্থা তাঁর সমালোচনাও করেছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ব্যবহার করে তিনি হকার এবং ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করেছেন।
নির্বাচনে লড়তে গত জানুয়ারিতে মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করেন বালেন। নেপালের প্রথাগত রাজনৈতিক নেতাদের মতো তিনি মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে খুব একটা সাক্ষাৎকার দেন না। পরিবর্তে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সাড়ে তিন কোটির বেশি অনুসারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখাই তাঁর পছন্দ।
স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বিশ্লেষক পুরঞ্জন আচার্য বলেন, 'বালেনকে যা বিশেষ করে তোলে তা হলো, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ছোট বার্তার মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর জন্য পথচলা খুব একটা সহজ হবে না।'
পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বালেন শাহ ভারতে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তুপাক শাকুর এবং ফিফটি সেন্টের মতো মার্কিন শিল্পীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে র্যাপ গান গাইতেন। তার গানগুলো নেপালের শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনা এবং দেশের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া তাঁর 'বালিদান' (উৎসর্গ) গানটি ইউটিউবে ১ কোটি ২০ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।
২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে দাঁড়িয়ে 'পরিবর্তনের সময়' স্লোগান দিয়ে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন তিনি।
গত ডিসেম্বরে সাবেক টিভি সঞ্চালক রবি লামিছানের নেতৃত্বাধীন আরএসপিতে যোগ দেন বালেন। তার দল পাঁচ বছরের মধ্যে ১২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাথাপিছু আয় ১,৪৪৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩,০০০ ডলারে উন্নীত করা এবং জিডিপি ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে, বালেন যদি নির্বাচিত হন, তবে তার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অচল প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সংস্কার করার জন্য নিজেকে কতটা যোগ্য লোক দিয়ে ঘিরে রাখতে পারেন তার ওপর।
আচার্য বলেন, 'এর জন্য একটি দল, বিশেষজ্ঞ এবং সমর্থন প্রয়োজন। বিদ্যমান রাষ্ট্রযন্ত্রের অধীনে তিনি কোনো কাজ করতে পারবেন না এবং উইপোকা খাওয়া কাঠের মতো শেষ হয়ে যাবেন।'
