ইউক্রেন যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়ানোর শঙ্কা, রাশিয়ার ক্ষতি ভিয়েতনাম যুদ্ধের ৫ গুণ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রায় চার বছর গড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অগ্রগতির কথা জোরেশোরে প্রচার করলেও বাস্তবতা হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোনো সংঘাতে কোনো পরাশক্তিকে এতটা ভয়াবহ প্রাণহানির মুখে পড়তে হয়নি।
রক্তক্ষয়ী এই সংঘাত থামার বা প্রাণহানি কমার কোনো লক্ষণই নেই। উল্টো রাশিয়াকে রুখতে, তাদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে নতুন সব যুদ্ধপ্রযুক্তি কাজে লাগাচ্ছে ইউক্রেন। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, চলতি বছরেই দুই পক্ষ মিলিয়ে নিহত যোদ্ধার সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার মধ্যে রুশ বাহিনীর সদস্যরাই বেশি।
অবশ্য যুদ্ধে ঠিক কত সেনা নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে মস্কো বা কিয়েভ—কেউই মুখ খুলছে না। নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা কঠোরভাবে গোপন রেখেছে দুই পক্ষই।
তবে কিছু পরিসংখ্যান বলছে, মোট নিহতের সংখ্যায় রাশিয়া অনেকটুকু এগিয়ে থাকলেও জনসংখ্যার অনুপাতে ইউক্রেন হারিয়েছে বেশি সেনা। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যত সেনা নিহত হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার নিহত সেনার সংখ্যা তার চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে ।
ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের শুরুর দিক থেকেই নিহত সেনাদের তালিকা তৈরি করছে স্বাধীন রুশ সংবাদমাধ্যম 'মিডিয়াজোনা' ও 'বিবিসি রাশিয়ান সার্ভিস'। মঙ্গলবার যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যম দুটি জানিয়েছে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত ২ লাখ ১৮৬ জন রুশ সেনার মৃত্যুর বিষয়টি তারা নিশ্চিত হতে পেরেছে। শোক সংবাদ, কবরস্থানের তথ্য, স্বজনদের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, রাশিয়ার সরকারি নানা তথ্য যাচাই-বাছাই করে এই তালিকা করা হয়েছে।
তবে তারা এটিও বলছে, এটি একেবারেই 'সর্বনিম্ন' হিসাব, চূড়ান্ত নয়। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। রাশিয়ার প্রায় ২৭ হাজার শহর ও গ্রাম থেকে আসা এসব সেনা ইউক্রেনে গিয়ে আর ফেরেননি।
এদিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) বলছে, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত রুশ সেনার সংখ্যা ৩ লাখ ২৫ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। মিডিয়াজোনা ও বিবিসি যেহেতু ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সব মৃত্যুর তথ্য পুরোপুরি সংগ্রহ করতে পারেনি, তাই সিএসআইএসের এই তথ্যই বেশ যৌক্তিক বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির হিসাব বলছে, যুদ্ধে নিহত ও আহত মিলিয়ে রাশিয়ার মোট হতাহত সেনার সংখ্যা ১২ লাখ ছুঁতে পারে।
সিএসআইএস-এর তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইউক্রেনের ৫ থেকে ৬ লাখ সেনা হতাহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে নিহতের সংখ্যাই ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার। অথচ চলতি মাসের শুরুতেই জেলেনস্কি যে হিসাব দিয়েছিলেন, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি।
যদিও মোটা অঙ্কের বোনাস আর কয়েদিদের দলে ভিড়িয়ে নিজেদের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে নিচ্ছে মস্কো। তাছাড়া রাশিয়ার জনসংখ্যাও ইউক্রেনের চেয়ে চার গুণের বেশি। জনশক্তির চরম ঘাটতি এখন বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউক্রেনের জন্য। সেনা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ধীরগতি আর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর ঘটনাগুলো সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা।
তবে লোকবলের এই ঘাটতি পোষাতে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে ইউক্রেন। তাদের লক্ষ্য, রাশিয়া মাসে যত নতুন সেনা নিয়োগ দিতে পারে, তার চেয়ে বেশি রুশ সেনাকে হত্যা বা জখম করা।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ দাবি করেন, গত ডিসেম্বরেই ৩৫ হাজার রুশ সেনা নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন, যা রাশিয়ার মাসিক গড় সেনা নিয়োগের সমান। তিনি বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য মাসে ৫০ হাজার রুশ সেনাকে অকেজো করে দেওয়া। রাশিয়াকে এমন চড়া মূল্য চোকাতে বাধ্য করা, যা তাদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হবে।'
