বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র—মিঠাপানিতে ঢুকছে সাগরের নোনাজল, বিপন্ন উপকূলীয় মানুষের জীবন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিয়েন্সে একজন বাসিন্দা খাওয়ার পানির জন্য কল ছাড়লেন, কিন্তু বের হলো নোনাজল। আবার বাংলাদেশে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে তাদের একসময়ের উর্বর আবাদি জমিকে আধা লোনাপানির পুকুরে পরিণত করছেন চিংড়ি চাষের জন্য। অন্যদিকে, গাম্বিয়ায় একজন কৃষক নিজের চোখে দেখছেন, নোনাজলে ডুবে তার খেতের ফসল কীভাবে শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সারা বিশ্বেই একসময়ের নির্ভরযোগ্য উপকূলীয় মিঠাপানির উৎসগুলো সাগরের পানিতে মিশে লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। নোনাজল ঢুকে পড়ার এই অদ্ভুত ও ধীরগতির সংকট এখন বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করছে।
সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যখন স্থলভাগের মিঠাপানির স্তরে ঢুকে পড়ে, তখন তাকে 'সল্টওয়াটার ইনট্রুশন' বলা হয়। গাম্বিয়া, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের মতো নিচু দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়লেও এটি এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এই সংকটের বাইরে নয়। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া বিশ্বের সব মহাদেশেই ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় এলাকাগুলোর অন্তত এক কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত নোনাজল ঢুকে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন ক্যারোলাইনা ইউনিভার্সিটির উপকূলীয় ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক রবার্ট ইয়ং বলেন, 'নোনাজলের এই আগ্রাসন দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে ঘটে। তবে বিশ্বজুড়ে খাওয়ার পানির উৎস, ধান চাষ এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক।'
তিনি বলেন, 'আমরা প্রায়ই ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো নিয়ে বেশি মাথা ঘামাই। কিন্তু ধীরগতিতে ঘটতে থাকা অন্যান্য বড় পরিবর্তনের দিকে আমাদের নজর থাকে না।'
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, 'অনেক সময় আমরা ভুল দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি নিই। অথচ জলবায়ুর এই ধীরগতির প্রভাবগুলোই আসলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।'
নোনাজলের আগ্রাসন
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক উপকূলীয় মিঠাপানির স্তরে ইতিমধ্যে নোনাজল ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকা দক্ষিণ ফ্লোরিডায়, যেখানে 'বিসকেয়েন অ্যাকুইফার' হলো মিঠাপানির প্রধান উৎস। সেখানে কৃষিকাজ ও খাওয়ার পানির সরবরাহ এখন হুমকির মুখে।
রোড আইল্যান্ডে নোনাজলে দূষিত হওয়া অনেক কূপের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দ্য গার্ডিয়ানের খবর অনুযায়ী, লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দারা তো কলের পানিতে লবণের স্বাদ পেতে শুরু করেছেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে ২০২৩ সালে অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর প্রেসিডেন্টের কাছে জরুরি অবস্থা জারির অনুরোধও করেছিলেন।
খাওয়ার পানিতে নোনাজল ঢুকে পড়া শুধু অস্বস্তিকরই নয়, বরং এটি স্বাস্থ্যের জন্যও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ত পানি পানকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও গর্ভাবস্থায় নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার ইউনিভার্সিটির উপকূলীয় হাইড্রোজোলজিস্ট হলি মাইকেল বলেন, নোনাজল সাধারণত মিঠাপানি ও লবণাক্ত পানির সংযোগস্থলে ঢুকে পড়ে। নোনাজল কতটা ভেতরে ঢুকবে, তা নির্ভর করে সমুদ্রপৃষ্ঠ ও স্থলভাগের পানির স্তরের ভারসাম্যের ওপর। তিনি বলেন, 'যেকোনো প্রক্রিয়ায় যদি এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তবেই নোনাজল স্থলভাগের দিকে এগোতে থাকে।'
হলি মাইকেলের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টিপাত কমছে এবং বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এসব কারণেই নোনাজল ঢুকে পড়ার এই প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের কিছু জায়গায় গৃহস্থালি, কৃষি ও শিল্পের কাজে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি তোলাও এই সংকটে বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ নোনাজল মাটি ও নদীতে ঢুকে পড়ছে।
নোনাজলের আগ্রাসনে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর উপকূলীয় কৃষকেরাই ইতিমধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার ছোট একটি গ্রাম সানকান্দি। প্রায় ৬০০ মানুষের বাস এই ম্যানগ্রোভসমৃদ্ধ গ্রামে। নার্স সেন্নেহ ছোটবেলা থেকেই সেখানে বাবা-মায়ের সঙ্গে ধান চাষ করে আসছেন। তাঁর বাবা-মা শিখিয়েছিলেন, ধানের চারা পানিতে ভালো বাড়ে। তাই শুধু বর্ষাকালেই ধান চাষ করা উচিত, যখন সেচের জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি পাওয়া যায়।
এই পদ্ধতি সেন্নেহের পরিবারের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কাজ করে আসছিল। ৫৯ বছর বয়সী সেন্নেহ বলেন, 'আমার বাবা খুব ধনী ছিলেন না। পরিবার চালাতে তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। কিন্তু বর্ষাকালে আমাদের ধানের বাম্পার ফলন হতো, যা দিয়ে পুরো বছর পরিবারের ভরণপোষণ চলত।'
বিয়ের পরপরই ১৯৮৭ সালে নিজে ধান চাষ শুরু করেন সেন্নেহ। তিনি জানান, নিজের খেতের বাম্পার ফলন দিয়ে তিনি অনায়াসেই তাঁর পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারতেন। কিন্তু প্রায় চার বছর আগে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে তাঁর এক হেক্টরের (আড়াই একর) ধানের খেতে যখন নোনাজল ঢুকতে শুরু করে, তখন থেকে ফলন কমতে থাকে।
পরিস্থিতি সেন্নেহের কাছে ছিল একেবারেই অচেনা। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, ধানের চারাগুলো আর বড় হচ্ছে না এবং ফলনও কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার অনেক চেষ্টা করেও শেষমেশ তাঁকে অন্য জায়গায় ধান চাষ শুরু করতে হয়।
গাম্বিয়া বিশ্বের অন্যতম নিচু দেশগুলোর একটি। দেশটিতে নোনাজল ঢুকে পড়ার ঘটনা প্রথম জানা যায় ১৯ শতকে। তবে গাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষিতত্ত্বের অধ্যাপক সিদাত ইয়াফফা বলেন, বর্তমান সময়ে এই সংকটের জন্য প্রধানত জলবায়ু পরিবর্তনই দায়ী।
গাম্বিয়ার ধান চাষের জন্য মিঠাপানির প্রধান উৎস গাম্বিয়া নদী, যার নামেই দেশটির নামকরণ করা হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম দীর্ঘ এই নৌপথটি এখন মারাত্মক হুমকিতে। ধান চাষের জন্য প্রচুর পানি প্রয়োজন হয়: মাত্র ১ কেজি ধান উৎপাদন করতে প্রায় আড়াই হাজার লিটার (৫৫০ গ্যালন) পানি লাগে।
অধ্যাপক ইয়াফফা বলেন, গাম্বিয়া নদী প্রায় সমুদ্রপৃষ্ঠের সমান উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এটি নোনাজলের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি দেশের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার (১৫৫ মাইল) ভেতর পর্যন্ত ঢুকে ধান উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত উপনদীগুলোতে গিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা। ইয়াফফার মতে, ১৯৭০-এর দশক থেকে দেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৩০% কমে গেছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিকমতো পূরণ হতে পারছে না এবং মাটি আরও লবণাক্ত হয়ে পড়ছে।
ইয়াফফা বলেন, 'এখন আমাদের দেশে বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে এবং বৃষ্টির পানি থেকে পাওয়া মিঠাপানির পরিমাণও কমে গেছে। এর বদলে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে নোনাজল উজানের দিকে ঠেলে গাম্বিয়া নদীতে এসে পড়ছে।'
লড়াইয়ের চেষ্টা ও খাদ্যের নিরাপত্তাহীনতা
গাম্বিয়ার ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির ২০২৪ সালের এক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নোনাজল ঢুকে পড়ার কারণে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটিতে ধান চাষের জমি ৪২ শতাংশ এবং উৎপাদন ২৬ শতাংশ কমেছে। এই পরিবর্তন মূলত ঐতিহ্যবাহী ধান চাষ খাতেই বেশি দেখা গেছে, যা হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম। এই নতুন পরিস্থিতি এমন একটি দেশে খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে, যেখানে হতদরিদ্র মানুষের ৯১ শতাংশই কৃষক।
সেন্নেহ কেবল একজন সাধারণ কৃষক নন, তিনি লড়াকুও। সমস্যাটি বুঝতে পারার পর তিনি একটি অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করেন। নোনাজল ঠেকাতে তিনি মাটির বস্তা ভরে খেতে পুঁতে রাখেন। কিন্তু তিনবার চেষ্টা করার পরও এই কৌশল কোনো কাজে আসেনি বলে জানান সেন্নেহ।
বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত ধানখেতটি ছেড়েই দিতে হয়েছে সেন্নেহকে। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, 'নোনাজল ঢুকে পড়ার কারণেই আমাকে ওই জমি ছাড়তে হয়েছে। এখন পুরো খেতটিই পতিত পড়ে আছে।'
সেন্নেহ এখন কাছাকাছি থাকা নিজের ছোট এক টুকরো জমিতে চাষাবাদ করেন। তবে আগের তুলনায় এখন এক-তৃতীয়াংশেরও কম ধান পান। তাঁর সাত সন্তান এখন আর পেট ভরে খেতে পারে না। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, 'আমার খুব কষ্ট হয়। একসময় আমার পরিবার তৃপ্তি করে খেত, কিন্তু এখন আর সেটা পারে না। এটি আমার জন্য অনেক বড় এক বোঝা।'
এখন সেন্নেহকে ২ হাজার ২০০ গাম্বিয়ান দালাসি (প্রায় আড়াই হাজার টাকা) দিয়ে এক বস্তা আমদানি করা চাল কিনতে হয়। তিনি বলেন, 'আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এমন একটা সময় আসবে, যখন আমাকে চাল কিনে খেতে হবে। এটা আমার জন্য খুব কষ্টের।'
গাম্বিয়ার প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ধান বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। দেশটি তাদের চাহিদার বেশির ভাগ চাল আমদানি করলেও, চাল কিনে খাওয়া অনেক কৃষকের কাছেই অচেনা এক বিষয়। গাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সিদাত ইয়াফফার মতে, যে দেশে মানুষের গড় মাসিক আয় ৫ হাজার দালাসির (প্রায় ৬ হাজার টাকা) কম, সেখানে চাল কিনে খাওয়াটা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে।
নোনাজল ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে লড়াই
ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও ডেলমারভা উপদ্বীপসহ বিশ্বের বিভিন্ন নিচু এলাকার কৃষকেরা এখন নোনাজলের এই আগ্রাসনের শিকার।
বাংলাদেশেও এমন পরিস্থিতির মুখে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক তাঁদের আবাদি জমিকে আধা লোনাপানির পুকুরে পরিণত করে চিংড়ি চাষ শুরু করেছেন। কিন্তু এই চিংড়ি চাষ মাটিকে আরও লবণাক্ত করে তুলছে এবং উপকূলীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অনেক সময় সংঘাতেরও জন্ম দিচ্ছে।
তবে নোনাজলের এই আগ্রাসনের কাছে মানুষ একেবারে হার মানছে না। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা মিঠাপানি ও নোনাজলকে আলাদা রাখতে সাহায্য করে।
ডেলাওয়্যার ইউনিভার্সিটির উপকূলীয় হাইড্রোজোলজিস্ট হলি মাইকেল বলেন, 'ফ্লোরিডা যা করেছে, তা হলো—খালগুলোতে জোয়ার নিয়ন্ত্রণের একধরনের ফটক (টাইড গেট) বসিয়েছে। এটি নোনাজলকে ভেতরের দিকে আসতে বাধা দেয়। ভাটার সময় তারা ফটকগুলো খুলে দেয়, যাতে ভেতরের পানি সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে।'
একইভাবে ভিয়েতনামও মেকং ব-দ্বীপ বা তাদের 'ভাতের থালা'কে নোনাজলের হাত থেকে বাঁচাতে কোটি কোটি ডলার খরচ করে স্লুইসগেট বা জলকপাট নির্মাণ করেছে। ২০১৬ সালে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে দেশটিতে হওয়া ভয়াবহ খরায় নোনাজল প্রায় ৯০ কিলোমিটার (৫৬ মাইল) ভেতর পর্যন্ত ঢুকে পড়েছিল। তবে এ ধরনের বড় প্রকল্পগুলো অনেক সময়ই প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিকল্প ও প্রযুক্তিগত সমাধান
হলি মাইকেল জানান, ফ্লোরিডায় আরেকটি প্রযুক্তিগত সমাধান হলো ব্যবহৃত পানির (ওয়েস্টওয়াটার) পরিশোধন। এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত পানি সংগ্রহ করে তা শোধন করে আবার নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, 'এটি ভূগর্ভস্থ নোনাজলকে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করে। এটি মূলত স্থলভাগের পানির স্তর বাড়ায় এবং যে পানি তোলা হয়েছিল, তা পূরণ করে দেয়।'
চীন ও নেদারল্যান্ডসও ব্যবহৃত পানি শোধনের এই পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ চীনের ইংলি শহরে শোধন করা বৃষ্টির পানি সরাসরি কৃষিজমিতে সেচের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অধ্যাপক ইয়াফফা জানান, গাম্বিয়াতেও ধানখেতে নোনাজল ঢোকা ঠেকাতে ১৯৯৪ সালে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, 'বাঁধটি একটি ভালো সমাধান ছিল। তবে এখন এটির অবস্থা খুবই খারাপ এবং বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।'
নোনাজলের এই আগ্রাসন থেকে বাঁচতে ভিয়েতনামের কৃষকদের জন্য বিভিন্ন বিকল্প সমাধানের খোঁজ চলছে। ২০১৬ সালের ওই ভয়াবহ খরার এক বছর পর, ট্রা ভিন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে কম পানির একটি নতুন ধান চাষ পদ্ধতির পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেন।
এই পদ্ধতিতে খেত একবার পানিতে ডোবানো হয় এবং পরে আবার শুকিয়ে ফেলা হয়। স্মার্টফোনের মাধ্যমে খেতের পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করতে কৃষকদের সাহায্য করেন গবেষকেরা। পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম 'মঙ্গাবে'র তথ্যমতে, অ্যাপ-সেন্সর প্রযুক্তির বর্তমান খরচ বেশ চড়া হলেও, গবেষকেরা মনে করেন, সেন্সরের দাম কমে আসায় খুব শিগগির এটি সাধারণ কৃষকদের নাগালে চলে আসবে।
মেকং কনজারভেন্সি ফাউন্ডেশনের পরিচালক ডুওং ভ্যান নি আরও একটি চমৎকার সমাধান বের করেছেন। তিনি এমন একটি সহজ ও হাতে বহনযোগ্য যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা দিয়ে কৃষকেরা সহজেই পরীক্ষা করতে পারেন, খেতের পানি ধান চাষের উপযোগী কি না। যদিও এটি পানির লবণাক্ততা কমাতে পারে না।
এ ছাড়া ডুওং ভ্যান নি মেকং ব-দ্বীপে একধরনের দেশি খাগড়া চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। এই খাগড়া লবণাক্ত মাটিতে খুব ভালো জন্মে। শুকিয়ে এগুলো দিয়ে ঝুড়ির মতো জিনিসপত্র বোনা হয়, যা বাজারে বিক্রি করে কৃষকেরা আয়ের বিকল্প পথ খুঁজে পেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির জলবায়ু অভিযোজন গবেষক লিজি ইয়ারিনা বলেন, 'এত সব সমাধানের পরও আসলে কোনো জাদুর কাঠি নেই। এক জায়গায় যা কাজে লাগছে, অন্য জায়গায় তা কাজে না-ও লাগতে পারে।'
জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা যত বাড়বে এবং জনসংখ্যার চাপে মিঠাপানির স্তরগুলোর ওপর চাপ যত বাড়বে, লবণাক্ততার এই সংকট ততটাই ভয়াবহ রূপ নেবে।
২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৭৭ শতাংশ উপকূলীয় এলাকাই লবণাক্ততার শিকার হবে। যার ফলে বিশ্বের অগণিত কৃষকের জীবন ও জীবিকা ক্রমেই আরও গভীর অনিশ্চয়তায় গিয়ে পড়বে।
গাম্বিয়ার সানকান্দি গ্রামে ফিরে যাওয়া যাক। ২০১৯ সালে ৬৩ বছর বয়সী বিনতা সিসেও তাঁর ধানখেতে নোনাজলের আগ্রাসন দেখতে পান। তিনি মাটিতে পশুর মল দিয়ে উর্বরতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু নোনাজল ঢোকা থামেনি। সেন্নেহের মতো তিনিও একটি অস্থায়ী বাঁধ দিয়েছিলেন, কিন্তু কাজ হয়নি। বাধ্য হয়ে তাঁকেও খেতটি ছেড়ে দিতে হয়, যেখানে একসময় প্রতি মৌসুমে অন্তত ৩০ বস্তা ধান পেতেন তিনি। সেই ধান দিয়ে পরিবারের খাবারের পাশাপাশি তাঁর সাত সন্তানের চিকিৎসায় আর স্কুলের খরচও চলত।
সেন্নেহ ও সিজে দুজনই এখন ধান চাষ ছেড়ে লেটুস বা বাঁধাকপির মতো সবজি চাষ করছেন। কিন্তু সেখান থেকে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়ে আমদানি করা চাল কেনাসহ অন্যান্য খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব। সিজে জানান, পরিবারের চাহিদা মেটাতে তিনি অনেক সময় তাঁর গ্রামের শুধু নারীদের জন্য গঠিত একটি সমিতি থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন।
অধ্যাপক ইয়াফফা আরও বেশি চাল আমদানির প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত। তিনি বলেন, 'আমার ভয় হচ্ছে, গাম্বিয়া, বিশেষ করে কৃষিভিত্তিক পরিবারগুলো চরম খাদ্যসংকটে পড়বে, যা তাদের জীবন ও জীবিকায় বড় আঘাত হানবে।' ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে 'দেশে তীব্র ক্ষুধা দেখা দেবে এবং এর জেরে দাঙ্গাও বেধে যেতে পারে' বলে তিনি মনে করেন।
সেন্নেহও এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত এবং একটি স্থায়ী সমাধানের আশায় দিন গুনছেন। তিনি জানেন, এই সংকটের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, 'আমি বাঁধ নির্মাণের পক্ষে। তা না হলে (নোনাজলের আগ্রাসন]) আরও খারাপের দিকে যাবে।আমাদের বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়বে।'
