টানা ৪ ঘন্টা সাঁতরে সমুদ্রে ভেসে যাওয়া মা, ভাই-বোনকে বাঁচাল ১৩ বছরের অস্ট্রেলীয় কিশোর
উত্তাল সাগরে ভেসে গিয়েছিল মা ও ছোট দুই ভাই–বোন। তাদের বাঁচাতে জীবনবাজি রেখে লড়ল ১৩ বছরের কিশোর অস্টিন অ্যাপেলবি। ঝড়ো বাতাস আর উত্তাল ঢেউয়ের বিপরীতে টানা চার ঘণ্টা সাঁতরে তীরে পৌঁছায় সে। এরপর আরও দুই কিলোমিটার দৌড়ে গিয়ে জরুরি নম্বরে ফোন করে উদ্ধারকারীদের খবর দেয়। তার এই অদম্য সাহসের কারণেই প্রাণে বেঁচেছে তার পুরো পরিবার।
ঘটনাটি ঘটেছে অস্ট্রেলিয়ায়। পার্থ শহর থেকে ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে কুইন্ডালুপ এলাকায় ছুটি কাটাতে গিয়েছিল পরিবারটি। গত শুক্রবার বিকেলে জিওগ্রাফ বে এলাকায় তারা 'ইনফ্ল্যাটেবল' (বাতাস দিয়ে ফোলানো) প্যাডেলবোর্ড ও কায়াক নিয়ে সাগরে নামে। কিন্তু তীব্র বাতাস তাদের তীর থেকে গভীর সাগরের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি জানিয়েছে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কায়াক (একধরনের ছোট নৌকা) চালিয়ে তীরে ফিরে সাহায্য আনার চেষ্টা করে অস্টিন। কিন্তু কায়াকে পানি ঢুকতে শুরু করলে সে সাঁতার কাটতে বাধ্য হয়। জীবন বাঁচাতে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে প্রায় চার কিলোমিটার পথ। সে সময় পরনে লাইফ জ্যাকেট থাকলেও সাঁতারের সুবিধার্থে দুই ঘণ্টা পর সেটি খুলে ফেলে সে।
অস্টিন বলে, 'লাইফ জ্যাকেট খুলে ফেলার পর পানিতে কিছু একটা দেখে খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু নিজের মনকে বোঝালাম, আমাকে পারতেই হবে। ভয় কাটাতে জীবনের সবচেয়ে খুশির মুহূর্তগুলোর কথা ভাবছিলাম।'
দীর্ঘ চার ঘণ্টা সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছানোর পর সে ক্লান্তিতে বালুর ওপর লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু পরিবারের কথা ভেবে উঠে দাঁড়ায় এবং দুই কিলোমিটার দৌড়ে গিয়ে জরুরি নম্বর '০০০'–এ ফোন দেয়। অস্টিন বলে, 'ফোনে আমি বলি—আমার হেলিকপ্টার লাগবে, বিমান লাগবে, নৌকা লাগবে। আমার পরিবার সাগরে ভেসে গেছে। আমি তখন শান্ত ছিলাম, হয়তো আতঙ্কেই এমনটা হয়েছিল।'
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে অস্টিনের ফোন পেয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযানে নামে পুলিশ ও স্থানীয় মেরিন রেসকিউ দল। রাত সাড়ে আটটার দিকে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার তাদের সন্ধান পায়। তখন অস্টিনের মা (৪৭), ছোট ভাই (১২) ও বোন (৮) একটি প্যাডেলবোর্ড আঁকড়ে ভাসছিল। পরে স্বেচ্ছাসেবীদের একটি উদ্ধারকারী জাহাজের মাধ্যমে তাদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
ন্যাচারালিস্ট ভলান্টিয়ার মেরিন রেসকিউ-এর কমান্ডার পল ব্রেসল্যান্ড জানান, পরিবারটিকে যখন খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তারা উপকূল থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে গভীর সাগরে ভাসছিল। উদ্ধারের আগে কয়েক ঘণ্টা ধরে তারা উত্তাল সমুদ্রে টিকে থাকার লড়াই চালিয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে অস্টিনের বুদ্ধিমত্তারও প্রশংসা করেন পল ব্রেসল্যান্ড। তিনি বলেন, অস্টিন তাদের কায়াক ও প্যাডেলবোর্ডের রঙের সঠিক বর্ণনা দিয়েছিল। গভীর সাগরে নির্দিষ্ট কোনো বস্তুকে খুঁজে পেতে এই তথ্য উদ্ধারকারীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
উদ্ধারের পর সেন্ট জন ডব্লিউএ-এর প্যারামেডিকরা তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে মা ও দুই শিশুকে বাসেলেটন হেলথ ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া হয়। এই উদ্ধার অভিযানকে 'অবিশ্বাস্য' বলে অভিহিত করেছে সেন্ট জন ডব্লিউএ কর্তৃপক্ষ। কিশোর অস্টিনের অসীম সাহসের প্রশংসা করতেও ভোলেননি তারা।
পুলিশ পরিদর্শক জেমস ব্রাডলি উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, সাগরের অবস্থা যে কত দ্রুত বদলে যেতে পারে, এই ঘটনা তার একটি বড় উদাহরণ। তারা সবাই লাইফ জ্যাকেট পরা ছিলেন বলেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
অস্টিনকে নিয়ে জেমস ব্রাডলি আরও বলেন, '১৩ বছরের কিশোরটির সাহস ও দৃঢ়তার প্রশংসা করে শেষ করা যাবে না। তার এই প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত মা ও ছোট ভাই-বোনের প্রাণ বাঁচিয়েছে।'
