বিশ্বজুড়ে বিলাসী খাবারের বাজার এখন চীনের দখলে
'মেড ইন চায়না' লেবেল এখন শুধু ইলেকট্রনিকস বা খেলনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং শিগগিরই এটি ভোজনরসিকদের মনোযোগ কাড়তে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত অভিজাত খাবারের বাজারে চীন এখন ভাগ বসাচ্ছে।
স্টারজিয়ন মাছের ক্যাভিয়ার (ডিম) এবং ট্রাফল (এক ধরনের মাশরুম) রপ্তানিতে চীন ইতিমধ্যেই বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে। এর পাশাপাশি ফোয়া গ্রা (হাঁসের কলিজা), জলপাই তেল, মাচা চা এবং দামি ওয়াইন উৎপাদনেও দেশটি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এসব বিলাসী খাবারের চাহিদা বাড়ছে।
বড় পরিসরে উদ্ভাবনের মাধ্যমে ক্যাভিয়ার উৎপাদনে চীন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। একুশ শতকের শুরুর দিকে স্টারজিয়ন মাছ চাষ শুরু করে দেশটি এখন বিশ্বের মোট ক্যাভিয়ার উৎপাদনের দুই-পঞ্চমাংশেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে।
চীনা প্রতিষ্ঠান 'কালুগা কুইন' ২০০৬ সালে উৎপাদন শুরু করে। 'মাল্টা' দেশটির চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ বড় একটি কৃত্রিম হ্রদে তারা মাছ চাষ করে। পানির তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রেখে তারা সারা বছর ক্যাভিয়ার উৎপাদন করে।
প্রতিদিন পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ স্টারজিয়ন মাছকে খাবার দেওয়া হয় এবং ড্রোন ব্যবহার করে মাছের সংখ্যা পর্যবেক্ষণ করা হয়। মাছের লিঙ্গ নির্ধারণে প্রচলিত পদ্ধতিতে তিন বছর লাগলেও কালুগা তা ছয় মাসে সম্পন্ন করতে পারে। ২০১৫ সালে কোম্পানিটি ১৫০ টন মাছের ডিম বা রো সরবরাহ করে বিশ্বের একক বৃহত্তম উৎপাদকে পরিণত হয়। ২০২৪ সালে তাদের উৎপাদন দাঁড়ায় ২৬০ টনে।
চীনের এই সাফল্যের পেছনে দেশটির বৈচিত্র্যময় ভূগোলও ভূমিকা রেখেছে। রৌদ্রোজ্জ্বল গানসু প্রদেশে গড়ে উঠেছে জলপাই তেলের শিল্প, আর পাশের পার্বত্য অঞ্চল নিংজিয়া তৈরি করছে মানসম্মত ওয়াইন।
অন্যদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমে গুইঝোউ অঞ্চলের উচ্চতা, আর্দ্রতা এবং কম সূর্যালোককে কাজে লাগিয়ে মাচা চা উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে জাপানের আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যারা এতদিন গ্রিন-টি পাউডার বা মাচার বৃহত্তম উৎপাদক ছিল।
মার্কেট-রিসার্চ ফার্ম 'মর্ডর ইন্টেলিজেন্স'-এর তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে বিলাসী খাবারের বাজার প্রায় ৫০ হাজার কোটি (৫০০ বিলিয়ন) ডলারের। ঐতিহ্যবাহী উৎপাদকরা তাদের বাজার ধরে রাখতে তৎপর। ফরাসি উৎপাদকরা তাদের ট্রাফলের 'ঘ্রাণগত গুণমান' আরও নির্দিষ্ট করার জন্য লবিং করছে। জাপান তাদের বিখ্যাত ওয়াগিউ মাংসের বিদেশি উৎপাদন ঠেকাতে অফিশিয়াল 'ওয়াগিউ মার্ক' চালু করেছে। এসব পদক্ষেপের কারণে চীনের জন্য 'নকল পণ্য' বিক্রির ধারণা কাটানো কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। অ্যালেন ডুকাসের মতো বিশ্বসেরা শেফরা এখন তাদের রান্নায় চীনা পণ্য ব্যবহার করছেন।
এছাড়া চীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ভৌগোলিকভাবে সুরক্ষিত খাবার ও পানীয়ের তালিকায় নিজস্ব কিছু বিলাসী পণ্য যুক্ত করছে। এর মধ্যে রয়েছে 'লিনকাং নাটস' (অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকাডামিয়া বাদামের সংকর), ফুজিয়ান জেসমিন টি, পু'য়ের টি ও কফি এবং জিনহুয়া পোর্ক। এটি বিশ্বজুড়ে ভোজনরসিকদের জন্য একটি ইতিবাচক দিক।
