যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তবে কী হতে পারে? সম্ভাব্য ৭ দৃশ্যপট
যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মুহূর্তে ইরানে হামলা চালাতে পারে বলে মনে হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পর ওই অঞ্চলে এত বিপুল বিমানশক্তি জড়ো করতে আর দেখা যায়নি যুক্তরাষ্ট্রকে।
অবশ্য এটি ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি 'ব্লাফ' বা চালও হতে পারে, যাতে তারা এমন কোনো চুক্তিতে রাজি হয় যা তারা আসলে চায় না। উপসাগরীয় আরব মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে যে, হামলার ফল উল্টো হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলো অনুমান করা সহজ, কিন্তু এর ফলাফল কী হবে তা একেবারেই অনিশ্চিত। আলোচনা ব্যর্থ হলে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দিলে কী ঘটতে পারে, তার সাতটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নিখুঁত হামলা, কম প্রাণহানি এবং গণতন্ত্রের পথে যাত্রা
এই দৃশ্যপটে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী সীমিত পরিসরে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে হামলা চালাবে। লক্ষ্যবস্তু হবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং বাসিজ বাহিনীর সামরিক ঘাঁটি, ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণ ও মজুদ কেন্দ্র এবং পরমাণু কর্মসূচি।
এতে দুর্বল হয়ে পড়া সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবে এবং ধীরে ধীরে ইরানে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। ইরান পুনরায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হবে।
এটি অত্যন্ত আশাবাদী একটি ধারণা। ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের মসৃণ পথ তৈরি করতে পারেনি। বরং স্বৈরশাসকের পতনের পর সেখানে বছরের পর বছর ধরে বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত চলেছে।
২. সরকার টিকে থাকবে তবে নীতি বদলাবে
একে অনেকটা 'ভেনেজুয়েলা মডেল' বলা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত ও শক্তিশালী পদক্ষেপে সরকার টিকে থাকবে, কিন্তু তাদের নীতিতে পরিবর্তন আসবে।
ইরানের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো—ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে থাকবে (যা অনেক ইরানি মেনে নিতে চাইবে না), কিন্তু তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করবে বা কমাবে। পাশাপাশি তাদের পরমাণু ও মিসাইল কর্মসূচি সীমিত করবে এবং বিক্ষোভ দমনে নমনীয় হবে।
তবে এটিও ঘটার সম্ভাবনা কম। ৪৭ বছর ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব অনড় অবস্থানে আছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এখন ৮০-এর কোঠায় এবং তিনি পরিবর্তন বা আপসে নারাজ।
৩. সরকারের পতন, সামরিক শাসনের উত্থান
অনেকে মনে করেন এটিই সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল।
সরকার অজনপ্রিয় হলেও এবং বিক্ষোভের কারণে দুর্বল হলেও, তাদের নিরাপত্তা বাহিনী বা 'ডিপ স্টেট' এখনো শক্তিশালী। আইআরজিসি ইরানের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
বিক্ষোভকারীরা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি কারণ তাদের পক্ষে কোনো বড় দলবদল বা 'ডিফেকশন' হয়নি। আর ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা যেকোনো মূল্যে টিকে থাকতে বলপ্রয়োগে প্রস্তুত।
মার্কিন হামলার পর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে ইরান শেষ পর্যন্ত আইআরজিসি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সামরিক সরকারের হাতে চলে যেতে পারে।
৪. পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র, আরব প্রতিবেশী ও ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করা
এটি ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।
ইরান গত মাসে প্রতিজ্ঞা করেছে যে কোনো মার্কিন হামলার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেছেন, আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের গালে 'থাপ্পড়' দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনীর শক্তির সঙ্গে ইরান পাল্লা দিতে পারবে না। তবে তারা তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে আঘাত হানতে পারে। এসব অস্ত্র মাটির নিচে বা পাহাড়ে লুকানো আছে।
উপসাগরের আরব দেশগুলোতে, বিশেষ করে বাহরাইন ও কাতারে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। ইরান চাইলে এসব ঘাঁটিতে বা জর্ডান ও ইসরায়েলের মতো দেশকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যদি তারা মনে করে ওই দেশগুলো হামলার সহযোগী।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন ও মিসাইল হামলা দেখিয়ে দিয়েছে যে, ইরানের মিসাইলের সামনে সৌদি আরব কতটা অরক্ষিত। তাই উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এখন চরম আতঙ্কে আছে। গত মাসে সৌদি আরব ও আমিরাত জানিয়েছে, তারা হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। তবে তাতেও তারা ইরানের প্রতিশোধ থেকে রেহাই পাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
৫. উপসাগরে মাইন পেতে রাখা
১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরান জাহাজ চলাচলের পথে মাইন পেতে রেখেছিল। তখন রয়্যাল নেভির মাইন সুইপাররা তা পরিষ্কার করেছিল। এবারও এটি বিশ্ববাণিজ্য ও তেলের সরবরাহের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
ইরান ও ওমানের মাঝখানের সরু 'হরমুজ প্রণালি' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের এলএনজি রপ্তানির ২০ শতাংশ এবং তেল ও তেলজাত পণ্যের ২০-২৫ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়।
জেনেভায় আলোচনার মধ্যেই ইরান কয়েক ঘণ্টার জন্য এই প্রণালি বন্ধ করে মহড়া চালিয়েছিল। ১৯৮০-এর দশকের পর এই প্রথম এমনটি ঘটল। বৃহস্পতিবার ওমান উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়াও চালিয়েছে তারা।
ইরান সাগরে দ্রুত মাইন ফেলার মহড়াও করেছে। যদি তারা এটা করে, তবে তেলের দাম ও বিশ্ববাণিজ্যে বড় প্রভাব পড়বে। অবশ্য এতে ইরানের নিজেরই ক্ষতি হবে, কারণ তাদের আয়ের প্রধান উৎস তেল এবং প্রধান ক্রেতা চীন এই পথ ব্যবহার করে।
৬. মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া
একবার এক মার্কিন নেভি ক্যাপ্টেন বলেছিলেন, তিনি ইরানের 'ঝাঁক হামলা' বা সোয়ার্ম অ্যাটাক নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত।
এতে ইরান একসঙ্গে অনেকগুলো বিস্ফোরক ড্রোন এবং দ্রুতগতির টর্পেডো বোট দিয়ে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিরক্ষাও সবগুলোকে একসঙ্গে ঠেকাতে ব্যর্থ হতে পারে।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া এবং নাবিকদের বন্দি করা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হবে বিশাল অপমান।
যদিও এটি ঘটার সম্ভাবনা কম, তবে ২০০০ সালে ইয়েমেনের এডেন বন্দরে আল-কায়েদার আত্মঘাতী হামলায় ইউএসএস কোল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ১৭ জন নাবিক নিহত হয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালে এক ইরাকি পাইলট ভুল করে মিসাইল ছুড়ে ইউএসএস স্টার্কে ৩৭ জন নাবিককে হত্যা করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করতে যাচ্ছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড শিগগিরই সেখানে পৌঁছাবে।
৭. সরকারের পতন, চরম বিশৃঙ্খলা
এটি কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তো আছেই। সেই সঙ্গে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে জাতিগত সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কুর্দি, বালুচ, আজেরি এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুরা ক্ষমতার শূন্যতায় নিজেদের সুরক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ, বিশেষ করে ইসরায়েল, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন দেখে খুশি হবে। কিন্তু ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে বিশৃঙ্খলা বা মানবিক ও শরণার্থী সংকট তৈরি হোক—এটা কেউ চায় না।
সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সীমান্তে বিশাল বাহিনী জড়ো করার পর যদি মনে করেন যে পিছু হটা যাবে না, তবে অনির্দিষ্টকালের জন্য এক যুদ্ধ শুরু হতে পারে। যার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং অনিশ্চিত।
