ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা: স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে, বেড়েছে তেলের দামও
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় বৃহস্পতিবার তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত প্রায় সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে তেলের দাম এবং বিনিয়োগকারীরা সোনার মতো নিরাপদ খাতের দিকে ঝুঁকেছেন।
বিশ্ববাজারের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক দশমিক ৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৭১ দশমিক ৬৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন ক্রুড তেলের দাম এক দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৬৬ দশমিক ৪৩ ডলার হয়েছে।
গত বুধবার তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি বাড়ার পর এবং অক্টোবর মাসের পর একদিনে সবচেয়ে বেশি দাম বৃদ্ধির পর তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে।
অনিশ্চয়তার মাঝে সাধারণত নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত সোনার দাম গত বুধবার দুই শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায় এবং প্রতি ট্রয় আউন্স পাঁচ হাজার ডলারের মাইলফলক পুনরুদ্ধার করে। বৃহস্পতিবার সোনার দাম কিছুটা ওঠা-নামা করে দশমিক দুই শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য গত কয়েক দিনে জেনেভায় মার্কিন ও ইরানি দূতরা সাক্ষাৎ করেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মঙ্গলবার বলেন, ইরানি আলোচকরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া কিছু 'রেড লাইন' বা সীমারেখার সঙ্গে একমত হয়নি।
এমন এক সময়ে এই আলোচনাগুলো চলছে যখন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সরঞ্জামগুলো মধ্যপ্রাচ্যের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। ইরানের সাথে সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা এবং এর ফলে তেলের দামের ব্যাপক বাড়তে পারার সম্ভাবনার কারণে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
ক্যাপিটাল ডট কম-এর সিনিয়র মার্কেট অ্যানালিস্ট ড্যানিয়েলা হ্যাথর্ন এক নোটে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন স্পষ্টভাবেই তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।'
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে স্বর্ণ অনেকটা 'মিম স্টক'-এর মতো লেনদেন হয়েছে, যেখানে দামে ব্যাপক অস্থিরতা ও ওঠানামা দেখা গেছে। সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হলেও, স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আবারও নিরাপদ সম্পদের চাহিদা বাড়িয়েছে, যার ফলে স্বর্ণের দাম পাঁচ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
যখনই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা দানা বাঁধে, তখনই সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় হরমুজ প্রণালির দিকে। ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত এই সরু জলপথটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রবাহের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'চোকপয়েন্ট' বা কৌশলগত সংকটপূর্ণ পথ।
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল প্রবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের ২০ শতাংশের সমান।
স্যাক্সো ব্যাংকের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি প্রধান ওলে হ্যানসেন এক নোটে বলেন, 'তেলের দামের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো একটি শক্তিশালী বাজার সংকেত দিচ্ছে এবং এটি ইতোমধ্যে বিদ্যমান উল্লেখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তেল ধমনীটি আবারও একটি সংঘাতের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে।'
ইরানি সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্যমতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান জানিয়েছে, তারা পূর্বপরিকল্পিত নৌ-মহড়ার জন্য হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
সাধারণত বাজারগুলো ভূরাজনৈতিক চাপের বিষয়গুলোকে ততটা গুরুত্ব দেয় না। তবে যখন এই ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি বিশ্ব তেল বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে—যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের মূল্য এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করে—তখন পরিস্থিতি বদলে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, বৈশ্বিক তেলের বাজারে ভেনেজুয়েলা এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় নয়। যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নিকোলাস মাদুরোর আটক হওয়ার খবরে বাজার আতঙ্কিত হয়নি। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত হতে শুরু করেন, কারণ দেশটি বিশ্ববাজারের প্রধান একটি কৌশলগত সংকটপূর্ণ পথ বা 'চোকপয়েন্ট'-এর খুব কাছে অবস্থিত।
ক্যাপিটাল ডট কম-এর হ্যাথর্ন বলেন, 'জ্বালানি বাজারে সম্ভাবনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে, বিশেষ করে যখন সম্ভাব্য বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কার সাথে একটি প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ট্রানজিট রুট জড়িত থাকে।'
তিনি আরও বলেন, 'তেলের বাজার এখন উচ্চতর ঝুঁকি বিবেচনা করে দাম নির্ধারণ করতে শুরু করেছে কারণ ইরান একটি প্রধান উৎপাদক রাষ্ট্র, এবং এর চেয়েও বড় কথা হলো, দেশটি হরমুজ প্রণালির ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত। এমনকি এই শিপিং লেন বা নৌ-পথে সীমিত কোনো বিঘ্ন অথবা কোনো বিশ্বাসযোগ্য হুমকিও বাজারে তাৎক্ষণিক এক সরবরাহজনিত ধাক্কা বা 'সাপ্লাই শক' তৈরি করতে পারে।'
হরমুজ প্রণালি ইরানের তেল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এই জলপথে তেলের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তা ইরানের রপ্তানি ব্যবসার পাশাপাশি চীনের মতো দেশগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যারা তাদের তেলের একটি বড় অংশ ইরান থেকে সংগ্রহ করে থাকে।
ইরানে সংঘাতের সম্ভাবনা তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা তেলের দামকে আকাশচুম্বী করে তুলতে পারে। তেলের উচ্চমূল্য ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের বিশ্লেষকরা এক নোটে লিখেছেন, 'আরও তাৎক্ষণিকভাবে বলতে গেলে, ইরানে হামলা হলে তেলের দাম এক লাফে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং বিশ্বের বেশিরভাগ অংশে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির হুমকি দেখা দেবে। এর ফলে বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানোর গতি বা সংখ্যা কমে যাবে।'
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারগুলো পতনের মধ্য দিয়ে দিন শেষ করেছে। ডাউ জোনস ২৬৮ পয়েন্ট বা দশমিক ৫৪ শতাংশ নিচে নেমেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক পড়েছে দশমিক ২৮ শতাংশ এবং প্রযুক্তি-নির্ভর নাসডাক কম্পোজিট দশমিক ৩১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
মন্টিস ফিনান্সিয়ালের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডেনিস ফলমার এক নোটে বলেন, 'যেহেতু মুদ্রাস্ফীতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি এখন হোয়াইট হাউসের প্রধান বিবেচ্য বিষয়, আমাদের ভাবতে হবে যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের প্রবাহ রক্ষা করা তাদের একটি অগ্রাধিকার। এর অর্থ হলো প্রথম অগ্রাধিকার হবে একটি কূটনৈতিক সমাধান, আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে এমন একটি সামরিক পরিকল্পনা যা তেলের প্রবাহকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখবে।'
২০২৫ সালের জুনে যখন ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তখন তেলের দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল। একইভাবে, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে এমন ভয় তৈরি হয়েছিল—যদিও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এবং সংঘাত থিতু হওয়ার সাথে সাথে তেলের দাম আবার নিম্নমুখী হয়েছিল।
