চীনের ‘হিউম্যানয়েড’ রোবটে মুগ্ধ বিশ্ব; কিন্তু তৈরি হয়নি বাজার, কিনবে কে?
চীনের বসন্ত উৎসবের জনপ্রিয় 'গালা অনুষ্ঠান' মানেই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আর প্রযুক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী। প্রতি বছর চন্দ্র নববর্ষের আগের রাতে বেইজিংয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সাধারণত সেনাদের কুচকাওয়াজ বা নাচ-গান দেখা যায়।
কিন্তু গত ১৬ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে দর্শকদের চোখ কপালে তুলে দিয়েছে একদল 'হিউম্যানয়েড' বা মানুষের মতো দেখতে রোবট। হাতে তলোয়ার নিয়ে নিখুঁতভাবে মার্শাল আর্ট প্রদর্শন করে বিশ্বকে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার জানান দিল চীন।
মানুষের মতো দেখতে রোবট তৈরির দৌড়ে চীন এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ওমডিয়া নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, গত বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০টি হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার। অবাক করার মতো তথ্য হলো, এই রোবটগুলোর প্রায় সবই তৈরি হয়েছে চীনে।
চীনের দুটি প্রধান প্রতিষ্ঠান—অ্যাজিবট ও ইউনিট্রিতে গত বছর ১০ হাজারের বেশি রোবট তৈরি করেছে। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের কোম্পানি টেসলা তাদের 'অপটিমাস' রোবট সরবরাহ করতে পেরেছে মাত্র ১৫০টি। শুধু রোবট তৈরিই নয়, রোবটের প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি বা পার্টস তৈরির ক্ষেত্রেও চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার।
রোবট শিল্পের এই জোয়ার পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের ধারণা, ভবিষ্যতে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পে পরিণত হবে। বিনিয়োগকারী ব্যাংক মরগান স্ট্যানলি মনে করছে, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে প্রায় ১০০ কোটি রোবট ঘুরে বেড়াবে এবং এই খাতে বার্ষিক খরচ সাড়ে ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে এই রোবটগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে। বর্তমানে বিক্রি হওয়া রোবটগুলোর সিংহভাগই কেবল প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ঘরের বা কলকারখানার বাস্তব কাজ করার মতো সক্ষমতা এখনো খুব কম রোবটেরই আছে।
চীনের রোবট বিপ্লবের নেপথ্যে রয়েছে তাদের শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন। উদাহরণ হিসেবে চাংঝু শহরের উজিন জেলার কথা বলা যায়। এখানকার ব্যবসায়ীদের দাবি, একটি রোবট তৈরিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ৯০ শতাংশই এই জেলায় তৈরি হয়। এমনকি টেসলার অপটিমাস রোবটের অনেক যন্ত্রাংশও এখান থেকেই যায়।
চীনের সাংহাই, জিয়াংসু এবং ঝেজিয়াং প্রদেশ নিয়ে গঠিত ইয়াংজি রিভার ডেল্টা এলাকাটি এখন রোবট শিল্পের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের সেরা ৩০টি রোবট যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তিন-চতুর্থাংশই এই এলাকায় অবস্থিত। আলিবাবার মতো প্রযুক্তি জায়ান্ট এবং ডিপসিক-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ল্যাবগুলোও এখানে কাজ করছে, যারা রোবটকে আরও বুদ্ধিমান করে তোলার প্রযুক্তি তৈরি করছে।
এত সব অর্জনের মাঝেও বড় একটি ঝুঁকি রয়েছে। চীনে এখন ১০০-র বেশি রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আছে। তাদের টিকিয়ে রাখতে সরকারি অনুদান বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, রোবটের বড় কোনো বাজার তৈরি হওয়ার আগেই চীন যেভাবে বিপুল অর্থ খরচ করছে, তা শেষ পর্যন্ত বড় কোনো অপচয় হিসেবেও দেখা দিতে পারে।
চীনের এই রোবট বিপ্লবে বড় ভূমিকা রাখছে দেশটির ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) শিল্প। ইয়াংজি রিভার ডেল্টা এলাকাটি চীনের মোট ইলেকট্রিক গাড়ির দুই-পঞ্চমাংশ উৎপাদন করে। মজার ব্যাপার হলো, একটি ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরিতে যেসব যন্ত্রাংশ লাগে—যেমন শক্তিশালী মোটর, লিথিয়াম ব্যাটারি, সেন্সর—সেগুলোর অনেক কিছুই হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতেও দরকার হয়।
গত কয়েক বছরে ইলেকট্রিক গাড়ির বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়ে যাওয়ায় যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন রোবট নির্মাতাদের দিকে ঝুঁকছে। আগে যেসব যন্ত্রাংশের জন্য চীনকে বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন সেগুলো দেশেই তৈরি হচ্ছে। যেমন রোবটের হাত-পা ঘোরানোর বিশেষ গিয়ার বক্স তৈরিতে এখন জাপানি কোম্পানিগুলোকে টেক্কা দিচ্ছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
চীনের হাংঝু শহরে গেলে কফি শপে আপনাকে কফি পরিবেশন করতে দেখা যেতে পারে রোবটকে। সাংহাইতে গত ডিসেম্বরে চালু হয়েছে 'বটশেয়ার' নামের একটি রোবট ভাড়া দেওয়ার পরিষেবা। বিভিন্ন দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আগত ক্রেতাদের হাত নেড়ে স্বাগত জানানোর জন্য এসব রোবট ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। একটি রোবট কিনতে যেখানে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার ৫০০ ইউয়ান লাগে, সেখানে মাত্র ২ হাজার ২০০ ইউয়ান তা ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
রোবটগুলো দেখতে চমৎকার হলেও তারা কি মানুষের বিকল্প হতে পারছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো না। বর্তমানে যেসব রোবট বিক্রি হচ্ছে, তার খুব সামান্য অংশই কারখানায় কাজ করছে। মূলত বাক্স টানাটানির মতো সহজ কাজগুলোই তারা করছে। আর সেখানেও একজন মানুষের তুলনায় তাদের কাজের দক্ষতা মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। মূলত রোবটগুলো এখনো মানুষের মতো বাস্তব বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে পারেনি।
রোবট শিল্পকে এগিয়ে নিতে চীন সরকার দুই হাত উজাড় করে টাকা ঢালছে। সাংহাইয়ের মতো শহরগুলোতে বিশাল বড় সেন্টার খোলা হয়েছে যেখানে ১০০টি রোবটকে একসঙ্গে কাজ শিখিয়ে তথ্য বা ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরাও এখন সেসব কোম্পানিকেই টাকা দিচ্ছেন যাদের পেছনে স্থানীয় সরকারের সমর্থন আছে।
বর্তমানে এই হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতাও খোদ চীন সরকার। গত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, বিক্রি হওয়া রোবটগুলোর বেশির ভাগই সরকার কিনেছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা উৎসবে সাজসজ্জা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।
তবে এই বিপুল বিনিয়োগ ও উদ্দীপনার মাঝে শঙ্কাও দেখছেন অনেকে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, রোবটগুলো যদি সত্যিই মানুষের বিকল্প হয়ে উঠতে না পারে এবং কেবল প্রদর্শনীতেই সীমাবদ্ধ থাকে, মানুষের বাস্তব প্রয়োজন ছাড়া শুধু হুজুগের ওপর ভর করে তৈরি হওয়া এই বিশাল বাজার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
