চীনে কয়লা খনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, প্রাণ হারালেন অন্তত ৯০ জন
চীনের একটি কয়লা খনিতে শক্তিশালী বিস্ফোরণে অন্তত ৯০ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। দেশটির শানসি প্রদেশের তংঝু গ্রুপের অধীনে পরিচালিত লিউশেনিউ কয়লা খনিতে এই গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ঘটনাস্থলে শত শত উদ্ধারকর্মীকে পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, আরও ২৭ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যার মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে খনি এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
শুক্রবার স্থানীয় সময় ১৯:২৯ মিনিটে (১১:২৯ জিএমটি) শানসির ওই খনিতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, বিস্ফোরণের সময় সেখানে ২৪৭ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।
যারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও বাকিদের আঘাত তুলনামূলক সামান্য। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, খনিতে বিষাক্ত গ্যাস নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণের ফলে বেশিরভাগ শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে সেটি ঠিক কী ধরনের গ্যাস ছিল তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।
আহত খনি শ্রমিক ওয়াং ইয়ং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, ঘটনার সময় তিনি কোনো শব্দ শোনেননি তবে হঠাৎ ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পান। তিনি বলেন, "আমি সালফারের গন্ধ পাচ্ছিলাম, অনেকটা ব্লাস্টিং করার পর যেমন গন্ধ পাওয়া যায় তেমন। আমি সবাইকে দৌড়াতে বলি। আমরা যখন দৌড়াচ্ছিলাম, তখন দেখছিলাম ধোঁয়ার কারণে অনেক মানুষ লুটিয়ে পড়ছে। এরপর একপর্যায়ে আমিও অচেতন হয়ে যাই।"
তিনি আরও বলেন, "আমি সেখানে প্রায় এক ঘণ্টার মতো পড়েছিলাম। পরে নিজে থেকেই আমার জ্ঞান ফেরে। এরপর পাশে থাকা একজনকে জাগিয়ে আমরা একসাথে খনি থেকে বেরিয়ে আসি।"
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা প্রদান এবং খনির ভেতরে আটকে পড়াদের সন্ধানে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একইসাথে তিনি এই দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করতে এবং এর জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খনিটি পরিচালনার সাথে যুক্ত কর্মকর্তাদের ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে। গ্যাস বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে খনিতে অত্যন্ত বিষাক্ত ও গন্ধহীন গ্যাস 'কার্বন মনোক্সাইড'-এর মাত্রা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছিল বলে জানা গেছে।
চীনের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য তারা ছয়টি বিশেষ দলের ৩৪৫ জন সদস্যকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে চীনের 'ন্যাশনাল মাইন সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' এই লিউশেনিউ খনিটিকে "গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ" হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। এমনকি খনিটি পরিচালনাকারী তংঝু গ্রুপকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে ২০২৫ সালে দুইবার প্রশাসনিক জরিমানাও করা হয়েছিল।
শানসি প্রদেশ থেকেই চীনের মোট কয়লা উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশের বেশি জোগান দেওয়া হয়। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে দেশটির কয়লা খনিগুলোতে প্রায়ই বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও মানদণ্ড কঠোর করা হলেও প্রায়ই এ ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
২০২৩ সালে উত্তরাঞ্চলীয় ইনার মঙ্গোলিয়া অঞ্চলের একটি কয়লা খনিতে ধসের ঘটনায় ৫৩ জন নিহত হয়েছিলেন। এর আগে ২০০৯ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হেইলংজিয়াং প্রদেশের একটি খনিতে বিস্ফোরণে ১০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা ব্যবহারকারী এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ। যদিও তারা বর্তমানে রেকর্ড গতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফরের মাত্র কয়েক দিন পরেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটল।
