ট্রাম্পের হুমকির মুখেই বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
হামলার হুমকির মধ্যেই আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দুই দেশের মধ্যকার চলমান চরম উত্তেজনা কমাতে আগামী শুক্রবার ইস্তাম্বুলে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কর্মকর্তারা জানান, এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ইরানের পক্ষে থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এ ছাড়া তুরস্ক, কাতার ও মিসরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও এতে অংশ নিতে পারেন।
অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন এক আরব কর্মকর্তা, এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা, ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং সাবেক এক কূটনীতিক।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেননি। অবশ্য আলোচনার এই পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
যদি শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি হয়, তবে তা হবে এক বিরল ঘটনা। কারণ ট্রাম্পের সামরিক হুমকি এবং ইরানের নেতাদের অনড় অবস্থানের কারণে দুই দেশ এখন যুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধের আতঙ্ক।
ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের জবাব
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প হুমকি দিয়ে আসছেন যে, ইরান তার দাবি না মানলে বোমা হামলা চালানো হবে। গত মাসে ইরানে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। দেশটির নেতারা প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করে সেই বিক্ষোভ দমন করেছেন।
ট্রাম্পের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সীমা মেনে নেওয়া এবং আরব বিশ্বে প্রক্সি মিলিশিয়া বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা।
তবে ইরানের নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হুমকির মুখে তারা কোনো আলোচনায় বসবেন না। আমেরিকার যেকোনো হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন তারা।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হতে থাকে। গত এক বছরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
অতীতের হামলা ও বিক্ষোভ
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল। তখন দাবি করা হয়েছিল, এতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা অনেকটাই পিছিয়ে গেছে।
গত মাসে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তখন ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালালে তিনি সামরিক হস্তক্ষেপ করবেন। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, নিরাপত্তা বাহিনী হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে সেই বিক্ষোভ থামিয়েছে।
ট্রাম্প গত মাসে তার দাবিগুলো পেশ করে বলেন, ইরান তা না মানলে তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন। তিনি ইরানে 'রেজিম চেঞ্জ' বা সরকার পরিবর্তনের কথাও তুলেছেন। কোনো সময়সীমা না দিলেও তিনি বলেছেন, সময় ফুরিয়ে আসছে।
তিনি ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশাল 'আর্মাডা' বা নৌবহর প্রবল শক্তি ও উদ্যম নিয়ে ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা এবং স্যাটেলাইট ইমেজেও ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ার প্রমাণ মিলেছে।
প্রতিবেশীদের উদ্বেগ
ইরান ও তার প্রক্সি বাহিনীগুলো মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মতো মিত্রদের জন্য হুমকি—এমন উদ্বেগ থেকেই ট্রাম্প এসব দাবি তুলেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ইরানের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডের বিরোধী। তবে ট্রাম্পের হামলার প্রতিশ্রুতিতে খুব কম প্রতিবেশীই সমর্থন দিয়েছে। তাদের ভয়, এমন পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলে বড় যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, 'অঞ্চলে সবাই মিলে যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তা ইরানের প্রতি সমর্থন নয়। বরং তারা ভয় পাচ্ছে যে আমেরিকার হস্তক্ষেপ এমন এক বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, যা কোনো সীমানা মানবে না।'
কূটনৈতিক তৎপরতা
সংঘাত এড়াতে গত কয়েক সপ্তাহে তুরস্ক, মিসর, ওমান ও ইরাকের কূটনীতিকরা দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছেন। দুই ইরানি কর্মকর্তা জানান, কাতারের প্রধানমন্ত্রীও সম্প্রতি কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইরান সফর করেছেন।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, আরাগচি এবং উইটকফ সরাসরি টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করছেন।
পরিস্থিতি শান্ত করতে ইরান একটি বড় ছাড় দিতে রাজি বলে জানিয়েছেন দুই কর্মকর্তা। তারা পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ বা স্থগিত করতে প্রস্তুত। তবে তারা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি প্রস্তাব পছন্দ করছে। সেটি হলো—পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম তৈরি করা।
ওই দুই কর্মকর্তা আরও জানান, ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বার্তা নিয়ে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করেছেন। বার্তায় বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের চুক্তির মতো ইরান এবারও তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় পাঠাতে রাজি হতে পারে।
সোমবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এ নিয়ে বলেন, 'বিষয়টি অনেক দিন ধরেই আলোচনার টেবিলে আছে। রাশিয়া সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।'
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, বোমা তৈরি নয়। আরাগচি বলেছেন, ইরান আলোচনার জন্য সব সময় প্রস্তুত।
সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, 'কূটনীতির মাধ্যমে ইরানি জনগণের অধিকার আদায়ের সুযোগ আমরা কখনোই হাতছাড়া করিনি।'
ইস্তাম্বুল বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করা এক কর্মকর্তা জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং পাকিস্তানও এই আলোচনায় অংশ নিতে পারে। তবে ওই দেশগুলোর কর্মকর্তারা আমন্ত্রণ পাওয়ার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করেননি।
