ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার শঙ্কা: আলোচনার জন্য তুরস্কে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আজ শুক্রবার সকালে একদিনের সফরে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে পৌঁছেছেন।
মেহের জানিয়েছে, তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন আঞ্চলিক মহাপরিচালকসহ তুর্কি কর্মকর্তারা আরাঘচিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন।
সংস্থাটি জানিয়েছে, সফরকালে আরাঘচি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মেহের আরও জানায়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।
জানা যায়, সম্ভাব্য মার্কিন হামলা প্রতিরোধে আলোচনার জন্যই আব্বাস আরাঘচির এই তুরস্ক সফর।
এর আগে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার এক রাষ্ট্রীয় সফরে তুরস্ক যাবেন।
তিনি বলেন, 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সুপ্রতিবেশীসুলভতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের নীতির ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীলভাবে জোরদার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।'
জানা যায়, তুর্কি কূটনীতিকরা তেহরানকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক সংঘাত এড়াতে হলে ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে ছাড় দিতে হবে।
এ লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসাউদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি ভিডিও কনফারেন্সের প্রস্তাব দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান।
বৃহস্পতিবার অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইরান ইস্যু নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনায় বসেছিলেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেছেন, তার বিভাগ ট্রাম্পের দেওয়া যে কোনো সামরিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম।
তিনি বলেন, 'ইরানের কাছে চুক্তি করার সব বিকল্প রয়েছে। তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত নয়। এবং প্রেসিডেন্ট যা প্রত্যাশা করবেন, তা করতে আমরা প্রস্তুত থাকব।'
ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, সময় দ্রুত কমে আসছে।
তিনি শপথ করে বলেছেন, ইরানে যদি মার্কিন হামলা করতেই হয়, তবে তা হবে মারাত্মক ও ব্যাপক। এমনকি তা ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের চেয়েও অনেক বেশি কঠোর হবে।
বৃহস্পতিবার রাতে কেনেডি সেন্টারে এক বক্তৃতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা করছেন।
তবে ইরান এখনও তার অবস্থানে দৃঢ়।
দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি জানিয়েছেন, গত জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরান তার কৌশল সংশোধন করেছে এবং ১,০০০ সামুদ্রিক ও ভূমি থেকে উৎক্ষেপণেযোগ্য ড্রোন তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, এই ড্রোন এবং ইরানের বিস্তৃত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার যেকোনো হামলার কঠোর জবাব দিতে সক্ষম।
তবে ইরানের সবচেয়ে বড় সামরিক দুর্বলতা হচ্ছে এর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, তারা 'সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে, একই সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলও ব্যবহার করছে।'
অন্যদিকে, ক্রেমলিন দুই পক্ষকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান দুই পক্ষের মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য উদ্বিগ্ন, কারণ এই ধরনের সংঘাত সহজেই পুরো অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে ইরানের জনগণ দেশটির কর্তৃপক্ষকে ছাড় দেওয়ার আহ্বান ত্রমে জোরালো হচ্ছে। দেশটির এক অংশ নেতৃত্বকে আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে, অন্য অংশ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করতে চায়।
ট্রাম্প স্পষ্টভাবে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু না বললেও তিনি দাবি করেছেন, সম্প্রতি ইরান সরকারের দমন-পীড়নের শিকার বিক্ষোভকারীদের রক্ষায় তিনি ইরানে হামলা করতে পারেন।
এছাড়া তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতেও হামলা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি ইরানের সরকার পতন ঘটাতে চাইছেন, অথবা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগে প্রভাব ফেলতে চাইছেন।
গত জুন মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের মাঝে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংসের দাবি করেছিলেন।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরবর্তীতে ট্রাম্পের দাবির বিরোধী তথ্য জানায়।
এর আগে, গত সোমবার এরদোয়ান ট্রাম্পের সঙ্গে ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান ওয়াশিংটনের নির্দিষ্ট দাবিগুলো পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে—উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর, অভ্যন্তরীণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার।
কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এই চারটি দাবিই ইরানের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হবে।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, 'ইরানে হামলা করা ভুল। আবার যুদ্ধ শুরু করাও ভুল। ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনার জন্য প্রস্তুত।'
তিনি স্বীকার করেন, দরকষাকষির টেবিলে ইরান বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ফিদান বলেন, 'এটি তাদের জন্য অপমানজনক মনে হতে পারে। শুধু জনগণের কাছেই নয়, নেতৃত্বের কাছেও বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে। তাই পরিস্থিতি যদি আরও সহনীয় করা যায়, তাহলে তা কাজে লাগেবে।'
ফিদান আরও বলেন, ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একটি নতুন ভাবমূর্তি উপস্থাপন করতে হবে।
তিনি জানান, ইরানি পক্ষকে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তাদের 'এই অঞ্চলে আস্থা তৈরি করতে হবে এবং আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের কীভাবে দেখছে, সে বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে।'
বৃহস্পতিবার আঙ্কারায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি টম ব্যারাকের সঙ্গে ফিদানের বৈঠক হয়।
এদিকে, ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশ জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।
