ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ: নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ যেভাবে রেকর্ড দামে জ্বালানি জোগাচ্ছে
যুগ যুগ ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণই বিনিয়োগকারীদের প্রথম পছন্দ। সহজে বহনযোগ্য এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বিক্রয়যোগ্য উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে স্বর্ণের অবস্থান এমন এক নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে, যখন চারপাশের সবকিছু টালমাটাল হয়ে ওঠে।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই গত এক বছরে বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে সোনার দিকে ঝুঁকেছেন—বিশেষ করে সোনাভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ)। এর পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে তার হুমকি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও তাদের স্বর্ণ মজুত বাড়িয়ে চলেছে।
এর ফলে মূল্যবান এই ধাতু একের পর এক দামের রেকর্ড ভেঙেছে এবং মূল্যস্ফীতি সমন্বিত হিসাব অনুযায়ী, এটা ১৯৮০ সালের সর্বোচ্চ মূল্যকেও ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ দিকে প্রথমবারের মতো প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ডলার অতিক্রম করে।
কেন স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় বলা হয়?
প্রতিদিন বিভিন্ন বাজারে শত শত বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ লেনদেন হওয়ায় এই বাজার যথেষ্ট তারল্য বা নগদ অর্থের জোগান থাকে। ফলে বড় বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে চোখে পড়বার মতো দাম না বাড়িয়েই যেকোনো সময় স্বর্ণের বাজারে তাদের পুঁজি নিবেশ করতে পারেন, অথবা বিক্রি করে বেরিয়েও যেতে পারেন। তাছাড়া, কোনো পক্ষনির্ভর সম্পদ না হওয়ায় স্বর্ণের মূল্য কোনো কোম্পানি বা রাষ্ট্রের সাফল্য কিংবা ঋণযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল নয়—যা অধিকাংশ আর্থিক সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
ঐতিহাসিকভাবে স্বর্ণের সঙ্গে মার্কিন ডলারের সম্পর্ক নেতিবাচক। স্বর্ণের দাম ডলারে নির্ধারিত হওয়ায় ডলারের মান কমলে অন্যান্য মুদ্রাধারীদের কাছে স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে ওঠে। অধিকাংশ বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতেই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার ও ডলারভিত্তিক স্থায়ী আয়ের সম্পদের বড় অংশ বিনিয়োগ করা থাকে। বর্তমানে ডলারের দরে ওঠানামা দেখা যাচ্ছে, আর তাই এই অস্থিরতা থেকে সুরক্ষা পেতে স্বর্ণের ভূমিকা বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণের ঊর্ধ্বগতি সার্বভৌম বন্ড ও মুদ্রার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যাকে 'ডিবেসমেন্ট ট্রেড' বলা হচ্ছে, এই বাণিজ্য বা লেনদেনে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী সোনা, রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকছেন—মুদ্রা ও বন্ডবাজারে পতনের ঝুঁকির মুখে সম্পদের মূল্য ধরে রাখার আশায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও বিনিয়োগকারীরা সতর্ক নজর রাখছেন। ট্রাম্প যখন ফেডারেল রিজার্ভের ওপর সুদের হার কমানোর জন্য চাপ বাড়াচ্ছেন, তখন সুদ না দেওয়া সম্পদ হলেও স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ সুদের হার কমলে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ আকর্ষণ হারায়। অন্যদিকে, যেহেতু ডলারের দর কম হতে থাকলে, স্বর্ণের দাম চড়ে, তাই এসময়ে স্বর্ণ হাতে রাখতেই পছন্দ করেন বিনিয়োগকারীরা।
বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, চলতি বছর ট্রাম্প যাকে ফেডের পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেবেন, তিনি বর্তমান চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের তুলনায় মুদ্রানীতিতে আরও শিথিল হবেন, অর্থাৎ সুদের হার কমাবেন। এসব হিসাবনিকাশও স্বর্ণের বাজারদরকে ঐতিহাসিক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
স্বর্ণ কি শুধু বিনিয়োগকারীরাই কেনেন?
বাজারের গতিবিধির বাইরেও ভারত ও চীনের সংস্কৃতিতে স্বর্ণের মালিকানা গভীরভাবে প্রোথিত, এই দেশ দুটি বিশ্বে স্বর্ণের সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব দেশে গয়না ও স্বর্ণ দিয়ে তৈরি অন্যান্য সামগ্রী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তর হয়। ভারতীয় পরিবারগুলোর কাছে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন স্বর্ণ রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ট নক্সে সংরক্ষিত স্বর্ণের পরিমাণের পাঁচ গুণেরও বেশি।
স্বর্ণের গয়নার চাহিদা দামের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। আর্থিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমতে শুরু করলে গয়না ও বার কেনা ক্রেতারা তখন কম দামে কেনার সুযোগ নিতে এগিয়ে আসেন, যা দামের নিচের সীমা তৈরি করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় অলঙ্কার হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
কেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বেশি স্বর্ণ কিনছে?
২০২৪ সালের শুরু থেকে স্বর্ণের দামের তীব্র উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক কেনাকাটা—বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে, যারা বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিট ক্রেতা হিসেবে স্বর্ণ কিনছে; তবে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এই প্রবণতা আরও জোরদার হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যখন তাদের দেশে রাখা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল জব্দ করে, তখন বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয় যে—বিদেশি মুদ্রাভিত্তিক সম্পদ এধরনের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে থাকে।
চীনের পিপলস ব্যাংক গত ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ১৪ মাস ধরে স্বর্ণ কিনেছে। অন্যদিকে, স্বর্ণ কেনার হিসাবে শীর্ষে থাকা পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানুয়ারিতে আরও ১৫০ টন স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা অনুমোদন দেয়, বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে।
স্বর্ণের দরে এই উত্থান কি থামতে পারে?
ডলারের মান শক্তিশালী হওয়া, ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে বড় ধরনের উত্তেজনা প্রশমিত হওয়া বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তিচুক্তি হলে তা স্বর্ণের দামে পতন ঘটাতে পারে।
এ বছর বিশ্বজুড়ে যেভাবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে টানাপোড়েন কিংবা ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের নেতা নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তারের পর লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা—এসব প্রশমিত হলে সোনার চাহিদাও কমতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিট কেনাকাটা কমে গেলে স্বর্ণের চাঙ্গা বাজারের (বুল মার্কেট) অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। স্বর্ণের দাম বাড়ায় কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুত তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। যেমন ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক নীতিনির্ধারক গত অক্টোবরে কিছু স্বর্ণ বিক্রির সুপারিশও করেছিলেন।
