শুল্ক আরোপের হুমকির পর রেকর্ড বেড়েছে সোনা ও রুপার দাম
গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিরোধিতা করা ইউরোপের আটটি দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকির পর সোমবার স্বর্ণ ও রুপার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে শেয়ারবাজারে বড় দরপতন ঘটেছে। খবর বিবিসির।
সোমবার স্বর্ণের দাম আউন্স প্রতি চার হাজার ৬৮৯ দশমিক ৩৯ ডলার (তিন হাজার ৪৯৯ পাউন্ড) স্পর্শ করেছে, যেখানে রুপার দাম আউন্স প্রতি সর্বোচ্চ ৯৪ দশমকি ০৮ ডলারে উঠেছে।
অনিশ্চয়তার সময়ে মূল্যবান ধাতুগুলোকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং গত এক বছরে স্বর্ণ ও রুপা উভয়ের দামই ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কায় ইউরোপের শেয়ার বাজারগুলোতে দরপতন ঘটেছে, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ড থেকে আসা পণ্যের ওপর ১০% শুল্ক ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। তিনি আরও জানান, এই শুল্ক পরে ২৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কোনো চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত এটি বলবৎ থাকবে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জবাবে মার্কিন আমদানির ওপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরো (৮০ বিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের একটি পাল্টা শুল্ক প্যাকেজ ঘোষণা করার কথা বিবেচনা করছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই বিবাদ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে তারা 'নিরাপদ আশ্রয়ের' সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ ও রুপার দিকে ঝুঁকছেন এবং এর ফলে এগুলোর দাম আরও একবার বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত বছর, স্বর্ণের দাম ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার একটি বড় কারণ ছিল বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
তবে এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আরও কিছু কারণ ছিল; যার মধ্যে রয়েছে সুদের হার আরও কমানোর প্রত্যাশা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর তাদের রিজার্ভে শত শত টন সোনা যোগ করেছে এবং রুপার ক্ষেত্রে—চীন রূপার রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা ঘোষণা করেছে।
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুজানা স্ট্রিটার বলেন, 'স্বর্ণ তার দ্যুতিময় ঊর্ধ্বগতির যাত্রায় নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক নীতির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে এই মূল্যবান ধাতুটি এখন আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।'
স্বর্ণ ও রুপার সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতি বজায় থাকলেও সোমবার শেয়ারবাজারের অবস্থা ছিল বেশ নাজুক।
লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক প্রায় ০.৪ শতাংশ কমে বন্ধ হয়েছে, যেখানে ঘরোয়া বাজার-কেন্দ্রিক কোম্পানিগুলোর প্রাধান্য থাকা এফটিএসই ২৫০ সূচকের পতন হয়েছে ০.৯ শতাংশ। আর্থিক ও শিল্প খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম কমলেও, মূল্যবান ধাতুর মূল্যবৃদ্ধির জেরে স্বর্ণ উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রেস্নিলো এবং এনডেভারের শেয়ারের দাম বেড়েছে।
পুরো ইউরোপ জুড়ে গাড়ি নির্মাতা, প্রযুক্তি এবং বিলাসদ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের বড় ধরণের দরপতন দেখা গেছে। জার্মানিতে ড্যাক্স সূচক কমেছে ১.৩ শতাংশ এবং গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ-বেঞ্জ ও ভক্সওয়াগনের শেয়ারের দাম প্রায় ২-৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ফ্রান্সের সিএসি ৪০ ইনডেক্স ১.৮ শতাংশ কমেছে, যার মধ্যে লাক্সারি ব্র্যান্ড এলভিএমএইচ এবং হার্মিস অন্যতম লোকসানের মুখে পড়েছে। তবে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারের দাম বেড়েছে; জার্মানির রাইনমেটাল এবং ফ্রান্সের থেলিস—উভয় কোম্পানির শেয়ারই চড়া মূল্যে লেনদেন হয়েছে।
সোমবার সরকারি ছুটি থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারগুলো বন্ধ ছিল। এ জে বেলের আর্থিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ড্যানি হিউসন বলেন, ইউরোপ এবং আমেরিকার মধ্যে একটি কষ্টার্জিত বাণিজ্য চুক্তি হয়তো এখন আর কার্যকর হবে না—এমন আশঙ্কাই ইউরোপীয় সূচকগুলোতে বড় ধরনের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প 'ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট' ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না, সে বিষয়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিতে যাচ্ছে; যে সিদ্ধান্তটি আজ মঙ্গলবারই চলে আসতে পারে।
হিউসন বলেন, 'যদি আদালত ট্রাম্পের শুল্ক বাতিল করে, তবে তা আরও একটি বড় বাজার অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।'
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে একটি।
আইএমএফ তাদের সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক আউটলুকে—যা বর্তমান শুল্ক হুমকির আগে তৈরি করা হয়েছিল—তারা বিশ্ব অর্থনীতিকে 'স্থিতিশীল' হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে প্রবৃদ্ধির ঝুঁকির তালিকায় তারা এআই প্রসারের সমাপ্তি এবং বাণিজ্যিক উত্তেজনার 'হঠাৎ বৃদ্ধি'র কথা উল্লেখ করেছে।
