স্বর্ণ ও রুপার দামে রোলারকোস্টার বছরে নাটকীয় সমাপ্তি
স্বর্ণ ও রুপা এমন এক বছরের শেষ প্রান্তে এসে তীব্র ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যে বছরে এই দুই মূল্যবান ধাতুর দাম ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে বড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে।
চলতি বছরে স্বর্ণের দাম ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে প্রতি আউন্স ৪,৫৪৯ ডলার (৩,৩৭৮ পাউন্ড) ছাড়িয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তবে বড়দিনের পর দাম কিছুটা কমে নতুন বছরের আগের দিন (নিউ ইয়ার্স ইভ) প্রতি আউন্স প্রায় ৪,৩৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে রুপার দামও ওঠানামার মধ্যে রয়েছে। সোমবার সর্বকালের সর্বোচ্চ ৮৩ দশমিক ৬২ ডলারে পৌঁছানোর পর বর্তমানে রুপা লেনদেন হচ্ছে প্রতি আউন্স প্রায় ৭১ ডলারে।
এ বছরের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে—এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার আরও কমতে পারে এমন প্রত্যাশা অন্যতম। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, চলতি বছরে তীব্র হারে মূল্যবৃদ্ধির ফলে ২০২৬ সালে স্বর্ণ ও রুপার দামে সংশোধন বা পতনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম এক্সএস ডটকম-এর বিশ্লেষক রেনিয়া গুলে বলেন, "বিভিন্ন অর্থনৈতিক, বিনিয়োগসংক্রান্ত ও ভূরাজনৈতিক ঘটনার পারস্পরিক প্রভাবের কারণে স্বর্ণ ও রুপার দামে উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, মূল্যবান ধাতুর দাম বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে এই প্রত্যাশা যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ২০২৬ সালেও সুদের হার কমাতে পারে। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনা এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের তথাকথিত 'নিরাপদ আশ্রয়' সম্পদের দিকে ঝোঁকও স্বর্ণ ও রুপার দামকে চাঙ্গা করেছে।
বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এজে বেলের মার্কেটস প্রধান ড্যান কোৎসওয়ার্থ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং শেয়ারবাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ ও রুপার দিকে ঝুঁকেছেন, যার ফলে এ দুই ধাতুর দাম দ্রুত বেড়েছে।
তিনি যোগ করেন, "২০২৬ সালে প্রবেশের সময়ও বাজারের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট খুব একটা বদলাচ্ছে না।"
কোৎসওয়ার্থ বলেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের উচ্চ ঋণের চাপ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং সম্ভাব্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বুদ্বুদ নিয়ে উদ্বেগ—এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণ ও রুপার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখতে উৎসাহিত করবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০২৫ সালে সম্পদগুলোর তীব্র মূল্যবৃদ্ধি আগামী বছরে বড় ধরনের দরপতনের ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
তার ভাষায়, "যদি আর্থিক বাজার কোনো কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যায়, তাহলে যেসব বিনিয়োগকারী নগদায়নের কথা ভাববেন, তারা আগে এমন সম্পদ বিক্রি করতে পারেন—-যেগুলো গত এক বছরে ভালো মুনাফা দিয়েছে বা যেগুলো সহজে বিক্রি করা যায়। স্বর্ণ এই দুই শর্তই পূরণ করে।"
রেনিয়া গুলে বলেন, তিনি আশা করছেন ২০২৬ সালেও স্বর্ণের দাম বাড়তে পারে, তবে তা হবে "২০২৫ সালে দেখা রেকর্ড উচ্চতার তুলনায় আরও স্থিতিশীল গতিতে।"
এ বছর বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভে শত শত টন স্বর্ণ যোগ করেছে বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল।
বিদায়ী বছরে স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দর বাড়ার বিষয়ে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান স্কাই লিংকস ক্যাপিটাল গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল তাকিয়েদ্দিন বলেন, রুপার দাম বাড়ার পেছনে সরবরাহ সংকট এবং শিল্পখাতে এই ধাতুর চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রুপা উৎপাদক দেশ চীন সম্প্রতি এই মূল্যবান ধাতুর রপ্তানি সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
অক্টোবরে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, "সম্পদ ও পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার করার" লক্ষ্যে রুপার পাশাপাশি টাংস্টেন ও অ্যান্টিমনির রপ্তানিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
চীন সরকারের রুপা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক বলেন, "এটা ভালো খবর নয়। বহু শিল্পপ্রক্রিয়ায় রুপা প্রয়োজন।"
তাকিয়েদ্দিন আরও বলেন, এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ)সহ বিভিন্ন বিনিয়োগ মাধ্যমে বিপুল অর্থ প্রবাহিত হওয়াও মূল্যবান ধাতুর বাজারকে চাঙ্গা করেছে।
ইটিএফ হলো এমন বিনিয়োগ প্যাকেজ, যা শেয়ারবাজারে একটি শেয়ারের মতো লেনদেন হয়। যা বিনিয়োগকারীদের সরাসরি স্বর্ণ বা রুপার বার না কিনেই মূল্যবান ধাতুতে বিনিয়োগের সুবিধা দেয় বলে এগুলোকে তুলনামূলক সহজ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।
তাকিয়েদ্দিনের মতে, আগামী বছরেও রুপার দাম আবার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "দাম বাড়ার পরপরই তুলনামূলকভাবে দামে আরও তীব্র সংশোধন দেখা যেতে পারে।"
