রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ স্বর্ণ ও রুপার বাজারে বড় দরপতন; কিন্তু কেন?
গত কয়েক দিন ধরে বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামের ব্যাপক ওঠানামা চলছে, বলা হচ্ছে 'রোলারকোস্টার রাইড'। গত এক বছরে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর গত শুক্র ও সোমবার দামের বড় ধরনের পতন হয়েছে। মঙ্গলবার দাম কিছুটা বাড়লেও তা এখনো বেশ নিচে রয়েছে।
কেন গত এক বছরে দাম এত বাড়ল?
বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ বা রুপার কদর সব সময়ই বেশি। কারণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এসব মূল্যবান ধাতু নিজের মান ধরে রাখতে পারে। ইতিহাস বলে, বিশ্ব যখনই কোনো সংকটে পড়ে, মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে ফেরার বিষয়টি বাজার অস্থির হওয়ার অন্যতম বড় কারণ। ট্রাম্পের খামখেয়ালি বা অপ্রথাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক আরোপ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ'-এর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের চাপ কিংবা গ্রিনল্যান্ডের মতো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল দখলের হুমকি—এসব বিষয় বিশ্ববাজারকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।
ট্রাম্পের এমন শাসনব্যবস্থার কারণে মার্কিন ডলারের মান দুর্বল হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ডলারের বদলে স্বর্ণের মতো 'নিরাপদ সম্পদ' বেছে নিচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মান হারাবে না। গত বছরের শুরু থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, আর রুপার দাম বেড়েছে প্রায় চারগুণ।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, মূল্যবান ধাতুর এই আকাশচুম্বী দাম মূলত বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকটকে ফুটিয়ে তুলছে। বছরের পর বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিভিন্ন দেশের ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এখন ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া জাপান ও ইতালির ঋণের বোঝাও বিশাল।
প্লেনিসফার ইনভেস্টমেন্টস-এর পোর্টফোলিও স্ট্র্যাটেজি প্রধান ডিয়েগো ফ্রানজিন বলেন, 'এমন এক বিশ্বে আমরা বাস করছি যেখানে প্রায় প্রতিটি আর্থিক কর্মকাণ্ডই ঋণের ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে। সেখানে স্বর্ণই একমাত্র সম্পদ যার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এটি কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না, কোনো সুদ দেয় না এবং কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। স্বর্ণের অস্তিত্বই এর নিরাপত্তা। আর ঠিক এ কারণেই বিনিয়োগকারীরা এর ওপর ভরসা করেন।'
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি ঋণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় স্বর্ণের এই মান ধরে রাখার ক্ষমতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার পেছনে আরও একটি বড় কারণ হলো বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা। বিশেষ করে চীন ও তুরস্কের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এখন বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ কিনছে। এসব দেশ মূলত মার্কিন ডলারের ওপর তাদের অতি-নির্ভরতা কমাতে চাইছে।
রেকর্ড উত্থানের পর বড় পতন
গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দাম সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ওই দিন প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে উঠেছিল। একই সময়ে রুপার দাম পৌঁছেছিল রেকর্ড ১২২ ডলারে।
তবে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা হঠাৎ হোঁচট খায় গত শুক্রবার। ওই এক দিনেই স্বর্ণের দাম ১০ শতাংশ এবং রুপার দাম ২৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। দাম কমার এই ধারা সোমবারও অব্যাহত ছিল। এদিন লেনদেন শেষে স্বর্ণ ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং রুপা প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ দর হারায়।
তবে মঙ্গলবার বাজার আবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। এদিন জিএমটি সকাল ৬টা পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং রুপার দাম সাড়ে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্বর্ণ ও রুপার এই অস্থিরতা আরও কিছুদিন বজায় থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে এই দুই ধাতুর গুরুত্ব কমছে না।
কেন নামল স্বর্ণ ও রুপার দাম?
স্বর্ণ ও রুপার দাম হঠাৎ কেন পড়ে গেল, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, দাম বাড়ার পেছনে যেমন ট্রাম্পের প্রভাব ছিল, কমার পেছনেও তাঁর সিদ্ধান্তই কাজ করেছে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ'-এর পরবর্তী প্রধান হিসেবে কেভিন ওয়ারশ-এর নাম ঘোষণা করেন। বাজারের জন্য এটি ছিল স্বস্তির খবর। কারণ, বিনিয়োগকারীরা ভয় পাচ্ছিলেন ট্রাম্প হয়তো তাঁর কোনো অন্ধ অনুসারীকে এই পদে বসাবেন, যিনি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামতো সুদের হার কমিয়ে দেবেন। কেভিন ওয়ারশ একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের সেই উদ্বেগ কেটেছে।
একই সঙ্গে ইরান ইস্যুতেও নিজের অবস্থান কিছুটা নরম করেছেন ট্রাম্প। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থার হুমকি দিলেও গত শুক্রবার তিনি সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরার আশা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক বিনিয়োগকারী নিরাপদ সম্পদ হিসেবে রাখা স্বর্ণ ও রুপা বিক্রি করে মার্কিন ডলারের দিকে ঝুঁকেছেন।
তবে অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের এই প্রভাবকে একমাত্র কারণ মানতে রাজি নন। তাঁদের মতে, স্বর্ণ ও রুপার দাম আসলে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল।
ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ার-এর এশিয়া অঞ্চলের গবেষণা প্রধান মার্ক ম্যাথিউস বলেন, 'সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে গত সপ্তাহে দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া। যখনই কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিতে স্বর্ণ-রুপা বিক্রি করা শুরু করলেন, তখন সেটা তুষারপাতের মতো বিশাল আকার ধারণ করল এবং হুড়মুড় করে দাম পড়ে গেল।'
দাম কি আবারও বাড়বে?
শেয়ারবাজারের আগাম পূর্বাভাস দেওয়া সব সময়ই কঠিন। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদে স্বর্ণ ও রুপার দাম বাড়ার সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
গত রোববার মার্কিন বহুজাতিক ব্যাংক জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকরা এক নোটে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আউন্সপ্রতি স্বর্ণের দাম ৬ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এটি বর্তমান দামের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষক গ্রেগরি শিয়ারার ও তাঁর সহযোগীরা বলেন, 'বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে স্বর্ণ এখনো একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এর চাহিদা আমাদের আগের পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে।'
অন্যদিকে ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ার-এর বিশ্লেষক মার্ক ম্যাথিউস মনে করেন, বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হলেই বিনিয়োগকারীরা আবারও স্বর্ণ ও রুপা কেনা শুরু করবেন।
তিনি বলেন, 'দাম বাড়ার প্রধান দুটি নিয়ামক এখনো অপরিবর্তিত আছে। প্রথমত, মার্কিন ডলারের মান সামনের দিনগুলোতে আরও কমবে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের মজুদে স্বর্ণের পরিমাণ বাড়ানো অব্যাহত রাখবে।'
ম্যাথিউসের মতে, স্বর্ণের দাম বাড়ার গতি হয়তো আগের মতো তীব্র হবে না, তবে এই ধীরগতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বাজারের জন্য ইতিবাচক।
