বিনিয়োগকারীরা কীভাবে স্বর্ণ কেনেন, দাম বাড়ে কেন?
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম রেকর্ড ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকেই ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। আর এর ফলেই স্বর্ণের বাজারে এই ঐতিহাসিক উল্লম্ফন।
বিদায়ী ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৬৪ শতাংশ, যা ১৯৭৯ সালের পর এক বছরে সর্বোচ্চ। নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি, মার্কিন সুদের হার কমানোর আভাস, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ক্রয় এবং 'ডি-ডলারাইজেশন' বা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতাই এর মূল কারণ। চলতি বছরের শুরুতেও এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে; এ বছর এখন পর্যন্ত দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ।
স্বর্ণে বিনিয়োগের উপায়
বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন উপায়ে স্বর্ণের বাজারে প্রবেশ করতে পারেন:
স্পট মার্কেট: বড় ক্রেতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বড় ব্যাংকগুলো থেকে স্বর্ণ কেনেন। স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম তাৎক্ষণিক চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। লন্ডনের বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলবিএমএ) এ ক্ষেত্রে প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে এবং ব্যাংক ও ডিলারদের মধ্যে বাণিজ্যের কাঠামো ঠিক করে দেয়। এ ছাড়া চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রও স্বর্ণ বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র।
ফিউচার মার্কেট: বিনিয়োগকারীরা ফিউচার এক্সচেঞ্জের মাধ্যমেও স্বর্ণে বিনিয়োগ করতে পারেন। এখানে নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট দামে পণ্য কেনা-বেচা হয়। নিউ ইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জের অংশ 'কোমেক্স' বাণিজ্যের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের ফিউচার মার্কেট। এ ছাড়া সাংহাই ফিউচার এক্সচেঞ্জ ও টোকিও কমোডিটি এক্সচেঞ্জও (টোকম) এশিয়ার বাজারে বড় ভূমিকা রাখে।
এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড প্রোডাক্ট (ইটিপি): ভৌত স্বর্ণ হাতে না নিয়েও ইটিপি বা ইটিএফ-এর মাধ্যমে স্বর্ণের দামের সুবিধা নেওয়া সম্ভব। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, উত্তর আমেরিকার ফান্ডগুলোর নেতৃত্বে ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের ইটিএফগুলোতে রেকর্ড ৮ হাজার ৯০০ কোটি (৮৯ বিলিয়ন) ডলার বিনিয়োগ এসেছে।
বার ও কয়েন: সাধারণ খুচরা ক্রেতারা দোকান বা অনলাইন থেকে স্বর্ণের বার ও কয়েন কিনতে পারেন। বর্তমানে স্পট মার্কেটে দাম বাড়ার কারণে চীন ও ভারতের মতো শীর্ষ ভোক্তা দেশগুলোর ক্রেতারা অলংকারের বদলে বার ও কয়েন কেনার দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
বাজার কেন চড়া?
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও বাজারের অনুভূতি: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডগুলোর আগ্রহ স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাজারের প্রবণতা, বিভিন্ন সংবাদ ও বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে ফাটকা বেচাকেনাও এতে প্রভাব ফেলে।
বৈদেশিক মুদ্রার হার: মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা থেকে বাঁচতে স্বর্ণ একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন ডলারের সঙ্গে স্বর্ণের দামের বিপরীত সম্পর্ক দেখা যায়। ডলার দুর্বল হলে অন্য মুদ্রার অধিকারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা সস্তা হয়, ফলে দাম বাড়ে।
মুদ্রানীতি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা: অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করা হয়। গত এক বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্ক আরোপের ফলে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যা মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক এবং গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ নিয়ে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বক্তব্য এই অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া সুদের হার কমলে স্বর্ণ ধরে রাখার সুযোগ ব্যয় কমে, যা দাম বাড়াতে সহায়তা করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণের রিজার্ভ
সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের মজুদ বাড়াচ্ছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জুনের বার্ষিক জরিপ বলছে, উচ্চ দাম সত্ত্বেও আগামী এক বছরে আরও অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করছে।
নভেম্বরেই নিট ৪৫ মেট্রিক টন স্বর্ণ কিনেছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ২৯৭ টন স্বর্ণ কিনেছে।
টানা ১৪ মাস ধরে স্বর্ণ কেনা অব্যাহত রেখেছে চীন। ডিসেম্বরের শেষে দেশটির স্বর্ণের মজুদ দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৪১ লাখ ৫০ হাজার ট্রয় আউন্সে, যা আগের মাসে ছিল ৭ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার ট্রয় আউন্স। এদিকে পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অ্যাডাম গ্লাপিনস্কি চলতি মাসে জানিয়েছেন, ২০২৫ সাল শেষে তাদের হাতে ৫৫০ টন স্বর্ণ থাকলেও তা ৭০০ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
