‘কেউই নিরাপদ নন’: এবার নিজের ঘনিষ্ঠ মিত্রকেই লক্ষ্য বানালেন শি জিনপিং
চীনের শীর্ষ জেনারেলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দীর্ঘদিনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এখন তার অতি ঘনিষ্ঠ মহলে পৌঁছে গেছে। এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, দলের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও কোনো সুরক্ষা দিতে পারছে না।
চীন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের মিত্র এবং পলিটব্যুরো সদস্য জেনারেল ঝাং ইউক্সিয়ার বিরুদ্ধে শি জিনপিংয়ের এই পদক্ষেপ প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতাকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত করবে। এটি চীনের সামরিক কমান্ডের এমনিতেই গোপনীয় কার্যক্রমকে আরও বেশি অস্বচ্ছ করে তুলবে। পাশাপাশি, এই ঘটনাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তাইওয়ানে অদূর ভবিষ্যতে হামলার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কম।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জোনাথন সিন বলেন, 'ঝাংকে অপসারণের অর্থ হলো—নেতৃত্বের পর্যায়ে থাকা কেউই এখন আর নিরাপদ নন।' তিনি এই তদন্তকে 'বিস্ময়কর' বলে অভিহিত করেছেন।
সিন—যিনি বহু বছর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-তে চীনা বিষয়ক শীর্ষ বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন এবং ২০২১-২০২৩ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে চীনা বিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন—তিনি আরও বলেন, এই তদন্ত চীনের রাজনীতিতে একটি 'গভীর পরিবর্তনের' চিহ্ন।
এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ অতীতে করা শুদ্ধি অভিযানগুলোর লক্ষ্য ছিল এমন ব্যক্তিরা যাদের সাথে শি-র হয়তো কিছুটা পরিচয় ছিল, কিন্তু কোনো শক্তিশালী ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না। এবার এই শুদ্ধি অভিযান শি-র রাজনৈতিক সৌরজগতের এমন এক স্তরে প্রবেশ করেছে যাকে জোনাথন সিন 'অ্যাস্টেরয়েড বেল্ট' (গ্রহাণু বেষ্টনী) হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
শি এবং ঝাং—উভয়েই 'প্রিন্সলিং', অর্থাৎ তারা সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সন্তান। ৭৫ বছর বয়সী এই জেনারেলের প্রাথমিকভাবে ২০২২ সালে অবসরে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শি তাকে চীনা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বদানকারী সংস্থা 'সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন' (সিএমসি)-এ তৃতীয় মেয়াদের জন্য রেখে দেন, যা তাদের মধ্যকার ঘনিষ্ঠতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত শনিবার জেনারেল ঝাং-এর বিরুদ্ধে একটি তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। তিনি সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে শি জিনপিংয়ের পরেই দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে 'শৃঙ্খলা ও আইন গুরুতর লঙ্ঘনের সন্দেহে' এই তদন্ত শুরু হয়েছে।
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর শি জিনপিংয়ের নির্দেশে পরিচালিত ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সামরিক বাহিনী। এই শুদ্ধি অভিযান ২০২৩ সালে অভিজাত 'রকেট ফোর্স' পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যারা পারমাণবিক অস্ত্রের পাশাপাশি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোও তদারকি করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে দুইজন সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
জোনাথন সিন বলেন, 'আমি মনে করি দুর্নীতির উদ্বেগগুলো সম্ভবত বাস্তব, যদিও চীনের রাজনীতিতে সাধারণত কাউকে অপসারণ করার জন্য এগুলোকে অজুহাত হিসেবে বেশি ব্যবহার করা হয়।' তিনি শি জিনপিংয়ের অভিযান শুরু হওয়ার আগে দেশটিতে দুর্নীতির শেকড় কতটা গভীরে ছিল তা উল্লেখ করে এই মন্তব্য করেন।
সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) জয়েন্ট স্টাফ ডিপার্টমেন্টের প্রধান এবং অপর এক জ্যেষ্ঠ সদস্য লিউ ঝেনলি-কেও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে সাত সদস্যের এই শীর্ষ সংস্থাটি কার্যত সংকুচিত হয়ে মাত্র তিনজনে (শি-সহ) দাঁড়িয়েছে, যার শীর্ষে রয়েছেন স্বয়ং শি।
এশিয়া সোসাইটির ফেলো নীল টমাস বলেন, 'শি জিনপিং চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শীর্ষ নেতৃত্বকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করেছেন যা তার আগের কোনো নেতা করেননি।'
হুমকি নির্মূলকরণ
রোববার 'পিএলএ ডেইলি'-র প্রথম পাতায় প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে এই তদন্তকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, দুই জেনারেল 'চেয়ারম্যান রেসপন্সিবিলিটি সিস্টেম' বা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ব্যবস্থাকে 'গুরুতরভাবে অবমূল্যায়ন ও লঙ্ঘন' করেছেন।
চীন সরকারের মতে, এই ব্যবস্থার অধীনে সিএমসি চেয়ারম্যান হিসেবে শি জিনপিংয়ের হাতেই সামরিক বাহিনীর 'সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা' ন্যস্ত থাকে। এটি সেনাবাহিনীর ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব অনুশীলনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবেও কাজ করে।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর চায়না অ্যানালাইসিসের সিনিয়র ফেলো লাইল মরিস বলেন, 'চেয়ারম্যান রেসপন্সিবিলিটি সিস্টেম লঙ্ঘনের অভিযোগ আনার অর্থ হলো, ঝাং সম্ভবত খোদ শি জিনপিংয়ের ক্ষমতার বলয়ের বাইরেও অত্যধিক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।'
'পিএলএ ডেইলি'-র প্রতিবেদনে বিস্তারিত কোনো তথ্য বা ক্ষমতার লড়াইয়ের কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। যদিও কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এটি আনুগত্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়, অন্যরা ঝাং-এর পক্ষ থেকে শি-র ক্ষমতার জন্য কোনো হুমকির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
মরিস বলেন, 'শি-র পক্ষ থেকে এই ধরনের নাটকীয় পদক্ষেপ নেওয়া দুটি বিষয় নির্দেশ করে। তা হলো: শি-র প্রতি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ সমর্থন রয়েছে এবং সামরিক বাহিনীর ওপর নিজের ক্ষমতার সংহতি নিয়ে তিনি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।'
ঝাং অতীতে পিএলএ-র সরঞ্জাম কেনাকাটা বিভাগ তদারকি করেছিলেন, যা শি-র নির্দেশে পরিচালিত ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তবে তিনি নিজে এতদিন পর্যন্ত রক্ষা পেয়ে আসছিলেন।
সিঙ্গাপুরের এস. রাজারত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পণ্ডিত জেমস চার বলেন, ঝাং-কে তদন্তের আওতায় আনার মাধ্যমে 'শি সেইসব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন যেখানে বলা হতো যে তার পিএলএ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান একটি বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়া—অর্থাৎ তার বন্ধু 'প্রিন্সলিং' (উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সন্তান) হওয়ার কারণে ছাড় পাচ্ছেন।'
চার আরও বলেন, '২০২৩ সালের শেষার্ধে তার অনুসারী লি শাংফু বিপদে পড়ার পরও ঝাং বহাল তবিয়তে বেঁচে গিয়েছিলেন।' উল্লেখ্য, সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতির সন্দেহে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি-কে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
নেতৃত্বের শূন্যতা
কিন্তু সামরিক নেতৃত্বকে এভাবে জনবলশূন্য করে রাখা এবং কোনো বিকল্প উত্তরসূরি না থাকা বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক বাহিনী কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ব্রুকিংসের গবেষক সিন বলেন, 'সত্যি বলতে এটা স্পষ্ট নয় যে সামরিক চেইন অফ কমান্ড এখন কীভাবে কাজ করবে—বিশেষ করে যেহেতু সিএমসি-র অপসারিত সদস্যদের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার যোগ্য কর্মকর্তাদের অনেকেই ইতিমধ্যে বহিষ্কৃত হয়েছেন।'
অন্যান্য বিশ্লেষকরা বলছেন, শি যতক্ষণ না কমিশন পুনর্গঠন করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত যৌথ প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের মতো উচ্চ-পর্যায়ের উদ্যোগগুলো ধীর হয়ে যাবে বলে তারা ধারণা করছেন।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্লুপাথ ল্যাবস-এর গবেষণা পরিচালক এরিক হুন্ডম্যান বলেন, 'এটি হয়তো নতুন সদস্য যুক্ত করার মতো হতে পারে, অথবা শি-কে কেন্দ্র করে প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে কোনো নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ও হতে পারে।'
এশিয়া সোসাইটির টমাস বলেন, শি সামরিক নেতৃত্বকে নতুন করে সাজাতে চান এবং সিএমসি-র শূন্যপদগুলোর জন্য উপযুক্ত প্রার্থীদের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে সম্ভবত আগামী বছরের কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন।
ততদিন পর্যন্ত সামরিক বাহিনী শি-র উচ্চাভিলাষী আধুনিকীকরণের লক্ষ্যগুলো পূরণে এগিয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন।
যদিও চীন কয়েক দশক ধরে কোনো যুদ্ধ লড়েনি, তবে তারা আঞ্চলিক সামুদ্রিক বিরোধ এবং স্বশাসিত তাইওয়ানের বিষয়ে ক্রমবর্ধমান কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। উল্লেখ্য, তাইওয়ানকে চীন নিজের অংশ বলে দাবি করে। গত বছরের শেষের দিকে বেইজিং তাইওয়ানের চারপাশে এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ সামরিক মহড়া চালিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোযোগ অন্য দিকে থাকা এবং ২০২৮ সালে তাইওয়ানে নির্বাচনের সূচি থাকায়, শি এখন 'ঘর গোছানোর' (শুদ্ধি অভিযান) জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নীল টমাস বলেন, 'পিএলএ-র উচ্চপদস্থ কমান্ডকে এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, শি অদূর ভবিষ্যতে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বড় কোনো সামরিক উত্তেজনার কথা ভাবছেন না। কিন্তু তার এই কঠোর অভিযানের লক্ষ্য হলো এমন একদল দক্ষ ও অনুগত জেনারেল তৈরি করা যারা ভবিষ্যতে আরও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।'
তিনি আরও বলেন, 'শি একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে চলছেন। দল এবং সামরিক বাহিনী যাতে রাজনৈতিকভাবে অনুগত এবং আদর্শিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে, তা নিশ্চিত করতে তিনি যা প্রয়োজন তা-ই করবেন।'
