ট্রাম্পের ইরান আক্রমণ, শি বুঝতে পারছেন চীনকে আরও শক্তিশালী হতে হবে
গত সপ্তাহে ইরানে আকস্মিক ও তীব্র হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহতও হয়েছেন। অসম এই যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ—চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করছে যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত পেশিশক্তিই সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক।
বহু বছর ধরে চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং তাঁর দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বৈরিতার বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন এবং সামরিক বাহিনীকে একটি বিশ্বমানের শক্তিতে রূপান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এই পদক্ষেপকে "ইস্পাতের মহাপ্রাচীর" গড়ে তোলার লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন—যা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরোধ করতে এবং বেইজিংয়ের শর্তে শান্তি নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
শি জিনপিং একবার বলেছিলেন, "আক্রমণকারীদের সঙ্গে তারা যে ভাষা বোঝে সে ভাষাতেই কথা বলতে হয়।" তিনি আরও বলেন, "আগ্রাসন ঠেকাতে যুদ্ধ লড়তে হয় এবং শান্তি ও সম্মান অর্জনের জন্য বিজয় প্রয়োজন।"
এক দশকের বেশি সময় ধরে "গুলির জবাবে গুলি ফেরত" দেওয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা শি চালিয়ে আসছেন, তা এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহারে কোনো রাখঢাক রাখছেন না। সমর শক্তির এই নির্বিচার প্রয়োগ বিভিন্ন দেশের সরকারকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং সেই বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে, যার নেতৃত্ব ভবিষ্যতে নিজেদের হাতে দেখতে চায় চীন।
ট্রাম্প ক্ষমতায় দ্বিতীয় মেয়াদে ফেরার পর গত বছরেই চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ ফের শুরু হয়। এরপর উভয় শক্তির মধ্যে নাজুক একটি সমঝোতা অবশ্য হয়েছে, কিন্তু সেটির ভিত্তি নড়বড়ে। এই অবস্থায়, সমঝোতাকে দৃঢ় করতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বেইজিংয়ে শি ও ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সামরিক শক্তির ছায়া—যা ইরানের নেতা আলী খামেনিকে হত্যা এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করার মতো পদক্ষেপে দেখা গেছে—চীনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। খামেনি ও মাদুরো দুজনই বেইজিংয়ের কৌশলগত অংশীদার ছিলেন।
চীনা বিশ্লেষক ও কর্মকর্তারা মনে করেন না যে যুক্তরাষ্ট্র একইভাবে শি জিনপিংকে লক্ষ্যবস্তু করবে, কারণ চীন একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ট্রাম্প যেভাবে যুদ্ধের পথ বেঁছে নিচ্ছেন, তা আবারও বেইজিংয়ের সেই বিশ্বাসকে জোরদার করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রই চীনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হুমকি।
চীনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ঝেং ইয়ংনিয়ান, যিনি চাইনিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকং-এর শেনজেন ক্যাম্পাসে কর্মরত, বলেছেন চীনে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। তাঁর মতে, চীনকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যাতে জাপান ও ফিলিপাইন—যারা যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভিত্তিক মিত্র—পূর্ব এশিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার "ইসরায়েল" হয়ে না ওঠে।
দ্য বেইজিং নিউজকে তিনি বলেন, "আমাদের নিশ্চিত করতে হবে এসব দেশ যেন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে খেলনা হয়ে তার লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে।"
সাংহাই-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শেন ডিংলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির এই প্রদর্শন চীনকে "শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বাস্তববাদী দৃষ্টিতে ভাবতে বাধ্য করছে।"
তিনি বলেন, "বেইজিং এখন আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার ব্যাপ্তি কতটা।"
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যেভাবে দৃষ্টি রেখেছিল, চীন এই সংঘাতকেও অনেকটা সেভাবেই পর্যবেক্ষণ করছে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত সামরিক প্রযুক্তির শক্তিশালী প্রদর্শন চীনের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে তারা পিপলস লিবারেশন আর্মিকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়।
এই সপ্তাহে চীনের সামরিক বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গ্রাফিক প্রকাশ করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান হামলা থেকে শিক্ষণীয় পাঁচটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে "উচ্চতর ফায়ারপাওয়ারের গুরুত্ব", যা শি জিনপিংয়ের বারবার উচ্চারিত বক্তব্যকেই প্রতিধ্বনিত করেছে। এছাড়া সেখানে "স্বনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তা"ও উল্লেখ করা হয়েছে—সম্ভবত জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিদেশ নির্ভরতা কমানোর চীনের প্রচেষ্টার ইঙ্গিত হিসেবে।
তবে তালিকার শীর্ষে ছিল "অভ্যন্তরীণ শত্রু" থেকে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা। এটি মূলত বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি এবং সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে তথাকথিত "কালার বিপ্লব" উসকে দেওয়ার আশঙ্কার প্রতি বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের ভীতির প্রতিফলন।
এই ধরনের হুমকি ঠেকাতে শি একটি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। এমন হুমকি বাস্তবও হতে পারে—গত মাসে সিইএ চীনের সামরিক বাহিনীর ভেতর গুপ্তচর নিয়োগের উদ্দেশ্যে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে শি'র দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যার ফলে ইতোমধ্যে বহু জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা পদচ্যুত হয়েছেন।
এই সংঘাত থেকে চীনের জন্য একটি বড় শিক্ষা হলো—ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় প্রবেশ করে আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। কারণ যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম বোমা ইরানের ওপর পড়ছিল, তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা চলছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল। বেইজিংয়ের কাছে এটি ছিল প্রতারণা এবং মার্কিন শক্তির অপব্যবহারের উদাহরণ।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, "আলোচনা চলাকালে হামলার সিদ্ধান্ত একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এতে বোঝা যায়, কূটনীতি সমান সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর আলোচনার ক্ষেত্র নয়, বরং প্রভাবশালী শক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল একটি হাতিয়ার।"
চীনা বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র আরও অনিশ্চিত এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, যা চীনকে আরও সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে।
চীনের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও বর্তমানে স্বাধীন বিশ্লেষক সং ঝংপিং বলেন, "চীনের জন্য কৌশলগত শিক্ষা খুবই সরল— এখানে ধরে নেওয়া যাবে না যে প্রতিপক্ষ নিয়ম মেনে খেলবে। তারা সতর্কবার্তা ছাড়াই আঘাত হানতে পারে এবং প্রয়োজনে খেলার নিয়ম বা যুদ্ধের নিয়ম—কোনোটিই মানবে না।"
এই বাস্তবতা বেইজিংকে ওয়াশিংটনের আন্তরিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে, বিশেষত এমন সময়েও যখন ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সংঘাত কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। সম্প্রতি তার প্রশাসন বেইজিংয়ের দাবিকৃত স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির একটি প্যাকেজ ঘোষণাও স্থগিত করেছে।
এটি আপাতদৃষ্টিতে শান্তির বার্তা মনে হতে পারে, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে শি জিনপিং তাতে খুব একটা আশ্বস্ত হবেন না। আর সামরিক শক্তি বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকেও সরে আসবেন না।
চীনকেন্দ্রিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান- অ্যাসডাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ–এর প্রধান কিরস্টেন অ্যাসডাল বলেন, "বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র তার কর্মকাণ্ডকে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরে।
কিন্তু বাস্তবে তারা যে শান্তির প্রস্তাব দেয়, তা আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শান্তির।"
তিনি বলেন, "শি জিনপিং চীনের জন্য এমন শান্তি চান না। তিনি চান চীনের বিজয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শান্তি।"
এই লক্ষ্য অর্জনে শি ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছেন। বিশাল নৌবাহিনী এবং স্টেলথ ড্রোন ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উন্নত অস্ত্র এতে যুক্ত হয়েছে। চীন যদি তাইওয়ানে হামলা চালায়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ঠেকানোর জন্যই এগুলো তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি—মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের নিয়ন্ত্রণও বিশ্বে বেইজিংয়ের প্রভাব অনেক বাড়িয়েছে। এর ফলে ট্রাম্পকে শুল্ক নীতিতে কিছুটা পিছু হটতেও হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার চীনের জাতীয় আইনসভা দেশের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংসহ কৌশলগত প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করা যায়।
এই পদক্ষেপগুলো দেখায় যে শি জিনপিং ও ট্রাম্প দুজনেই শক্তির গুরুত্ব বোঝেন, তবে সেই শক্তি অর্জন ও ব্যবহারের পদ্ধতিতে তাদের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপগুলোকে ব্যবহার করে নিজেদেরকে তুলনামূলকভাবে শান্তিপ্রিয় ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু, তাইওয়ান প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী সামরিক আচরণ বিপরীত চিত্রও তুলে ধরে।
এর ব্যাখ্যায় পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল কোঅপারেশন অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ওয়াং দং বলেন, "চীনের জন্য শক্তি মানে আত্মরক্ষা ও স্থিতিশীলতা—বিস্তারবাদ নয়।"
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যখন শক্তি বাড়ায়, তখন তা "অসামঞ্জস্যপূর্ণ সামরিক পেশিশক্তির" ওপর নির্ভর করে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য—যেমন ইরানে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠা—নিশ্চিত করার গ্যারান্টি দেয় না।
ওয়াং বলেন, "আমরা যা দেখছি, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন একটি ক্ষীয়মাণ বিশ্বব্যবস্থার শেষ প্রচেষ্টা।"
তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা চীনের এই সংযমী অবস্থান নিয়ে সন্দিহান। তাদের মতে, বেইজিংও শেষ পর্যন্ত বিদেশে বৃহত্তর সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলতে বাধ্য হতে পারে। এতে চীনের বিদেশে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক র্যান্ড কর্পোরেশনের চীন গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক জুড ব্লানশেট বলেন, "চীনও সেই শক্তির আকর্ষণে টান অনুভব করবে, যা সব বড় শক্তিকে তাদের ক্ষমতাবলয়ের বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত করার দিকে ঠেলে দেয়।"
