গুরুতর দুর্ঘটনা বাড়ায় ‘ফ্যাটবাইক নিষিদ্ধের’ প্রস্তুতি নিচ্ছে আমস্টারডাম
দুপুরের ব্যস্ত সময়ে, আমস্টারডামের ভনডেলপার্কের গাছের ছায়াঘেরা সরু রাস্তাগুলোতে চওড়া টায়ারের ইলেকট্রিক বাইকগুলো সাঁ সাঁ করে ছুটে চলে। কিন্তু দুর্ঘটনার সংখ্যা—বিশেষ করে শিশুদের ওপর দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তাই ডাচদের ভাষায় 'ফ্যাটবাইক' নামে পরিচিত এই যানবাহনগুলো নেদারল্যান্ডসের কিছু অংশে নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে।
এ কথা শুনে 'একদম বাজে কথা' বলে বিষয়টি উড়িয়ে দেন ৬৯ বছর বয়সী হেনক হেন্ডরিক ওলথারস। চওড়া টায়ারের ইলেকট্রিক 'মেট' বাইকের সিটে বসে তিনি বলেন, 'আমি গাড়ি চালাই, মোটরসাইকেল চালাই, আমার মোপেডও ছিল এবং এখন আমি ফ্যাটবাইক চালাই। এটি শহরের দ্রুততম যাতায়াতের মাধ্যম এবং এটি ব্যবহার করার সুযোগ থাকা উচিত।'
নেদারল্যান্ডসের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক এবং রাজনীতিবিদরা এতে একমত নন। যদিও ই-বাইকের মোটর চালিত গতিবেগ ঘণ্টায় মাত্র ১৫ মাইলের কিছু বেশিতে সীমাবদ্ধ থাকার কথা, তবুও অনেক ফ্যাটবাইক চালক এই ব্যস্ত পার্কে ঘণ্টায় ২৫ মাইল গতিতে চলার জন্য ফ্যাক্টরি সেটিংস পরিবর্তন করে ফেলেন।
নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা 'ভেইলিখেইডএনএল' সাম্প্রতিক কিছু হাসপাতালের দুর্ঘটনার নমুনা দেখেছে। এগুলোর ভিত্তিতে ধারণা করছে, প্রতি বছর প্রায় পাঁচ হাজার ফ্যাটবাইক চালক জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন। সংস্থাটির মুখপাত্র টম ডি বেউস বলেন, 'আমরা আরও দেখছি, বিশেষ করে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী তরুণদের ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।'
এখন আমস্টারডামের পরিবহন প্রধান মেলানি ভ্যান ডের হর্স্ট বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে 'ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ' নেওয়া প্রয়োজন এবং তিনি ভনডেলপার্ক থেকে শুরু করে শহরের পার্কগুলোতে এই ভারী ইলেকট্রিক বাইকগুলো নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এনশেড শহরের মতো—যারা শহরের কেন্দ্রেও নিষেধাজ্ঞা জারির পরিকল্পনা করছে—মেলানিও এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মূলত অসংখ্য মানুষের অনুরোধের ভিত্তিতে, যারা তার কাছে 'ফ্যাটবাইক নিষিদ্ধ করার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন'।
পার্কে তার (মেলানির) এই পরিকল্পনা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সাঁ সাঁ করে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া প্রতি পাঁচজন ফ্যাটবাইক চালকের মধ্যে চারজনই কথা বলতে চাইলে 'অত্যন্ত ব্যস্ত' বলে এড়িয়ে গেলেও, ৩১ বছর বয়সী জুস্ট ছিলেন সন্দিহান। তিনি বলেন, 'এটি অর্থহীন হবে। সাধারণ বাইসাইকেল এই পার্ক ব্যবহার করে, শহরের অন্যান্য যানবাহনও এটি ব্যবহার করে। মূল বিষয়টি হলো উপযুক্ত গতি বজায় রাখা।'
কিন্তু পোষা কুকুর 'জুপের' সঙ্গে দৌড়াতে থাকা ৩৩ বছর বয়সী মুরিয়েল উইঙ্কেল এ বিষয়ে বেশ উৎসাহী ছিলেন। তিনি বলেন, 'সবগুলোরই (বাইক) গতি বাড়ানো হয়েছে। মানুষ হয়তো এটি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে করেনি, তবে তারা প্রায়ই অসতর্কভাবে চালায়, চারদিকে খেয়াল রাখে না। মাঝে মাঝে আমার কুকুর সত্যিই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।'
অনেকে মনে করছেন, বৈদ্যুতিক বাইক ঘিরে যে উত্তেজনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শীঘ্রই অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে, বিশেষ করে যেখানে পরিবেশবান্ধব এবং সক্রিয় যাতায়াত ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার রাজনৈতিক আগ্রহ বাড়ছে।
নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে অগ্রগামী এই দেশটিতে, ২০২৪ সালে বিক্রি হওয়া মোট সাইকেলের ৪৮ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক এবং আরও ১৩ শতাংশ ছিল ফ্যাটবাইক—এমনটাই জানিয়েছে মোটরিং সংগঠন আরএআই ভেরেনিখিং ও বোভাগ। আমস্টারডামে মোট যাতায়াতের এক-তৃতীয়াংশই সাইকেলে করা হয়।
সড়ক সহায়তা সংস্থা এএনডব্লিউবি বলছে, সমস্যাটি মূলত চওড়া টায়ারের বাইক মডেলটির নয়—বরং মানুষ কত সহজে এর গতি বাড়িয়ে একটি মোপেডের মতো ব্যবহার করতে পারে সেটিই বড় সমস্যা, যার সাথে যুক্ত হয় চালকদের 'ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ'।
আমস্টারডাম সাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন 'ফিটসার্সবন্ড'-এর চেয়ারপারসন ফ্লোরি ডি প্যাটার বলেন, অবৈধ বাইকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কার্যকর তদারকির অভাবের কারণে বয়স্ক মানুষ ও শিশুরা রাস্তায় চলাচল করতে ভয় পাচ্ছে।
তিনি বলেন, 'দ্রুতগতিতে সাইকেল চালানো ব্যক্তিদের বিপদের কারণে, বিশেষ করে ৫৫ বা ৬০ বছরের বেশি বয়সীরা তাদের সাইকেলগুলো বাড়িতেই ফেলে রাখছেন। আমরা আরও শুনতে পাচ্ছি, বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের সাইকেলে করে স্কুলে পাঠাতে আর সাহস পাচ্ছেন না।'
মাস্ট্রিচ ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের পরামর্শক এবং মস্তিষ্ক আঘাত বিশেষজ্ঞ মার্সেল অ্যারিস বলেন, ২০২৭ সাল থেকে ইলেকট্রিক বাইকে শিশুদের হেলমেট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি আরও কর্তৃপক্ষের উচিত বিতর্কিত নিষেধাজ্ঞাগুলোর কথা বিবেচনা করা। তিনি বলেন, 'সরকার বা পৌরসভার জন্য এমন পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যৌক্তিক যা হয়তো অজনপ্রিয় হতে পারে। ক্রমবর্ধমান জনাকীর্ণ রাস্তা এবং গাড়ি, সাইকেল চালক ও পথচারীদের মধ্যে গতির ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের প্রেক্ষিতে এগুলো মূলত জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপ।'
এই মতের সঙ্গে একমত আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক মার্লিস শাইভেনও। ২০২৪ সালে বিপজ্জনক চালকদের নিয়ে করা তার একটি হতাশাজনক লিঙ্কডইন পোস্ট ২৯ লাখ বার দেখা হয়েছে। তিনি বলেন, 'এটি একটি ভালো পদক্ষেপ, কিন্তু খুবই ছোট পদক্ষেপ, যা কেবল আমস্টারডামের একটি পার্কে সীমাবদ্ধ। সমস্যাটি এর চেয়ে অনেক বড়। আমরা এখনও প্রতিদিন সকালে হাসপাতালের মিটিংয়ে বেদনা, দুর্দশা আর মৃত্যু দেখতে পাই।'
ফ্যাটবাইক মালিক ওলথারস নিজেও একমত যে, শিশুদের এই শক্তিশালী যানবাহন চালাতে দেওয়াই মূল সমস্যা। তিনি বলেন, 'শিশুরা লাল বাতি অমান্য করে চলে, তারা হাত দিয়ে সংকেত দেয় না এবং ট্রাফিক পরিস্থিতিও বুঝতে পারে না।' তিনি আরও বলেন, হাসপাতালগুলোতে তাদের জন্য একটি হাড়হিম করা শব্দ ব্যবহার করা হয়, 'সম্ভাব্য অঙ্গদাতা' (পটেনশিয়াল ডোনার)।
