ইউক্রেনে রাতভর রুশ হামলা, আবুধাবিতে ভেস্তে গেল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে আয়োজিত ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার দ্বিতীয় দিনের আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শনিবার শেষ হয়েছে। তবে আগামী সপ্তাহে আরও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ একই সময়ে, হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে রাশিয়ার রাতভর বিমান হামলায় ইউক্রেনের ১০ লাখের বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন।
আলোচনা শেষে দেওয়া বিবৃতিতে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, তবে মস্কো এবং কিয়েভ—উভয় পক্ষই জানিয়েছে যে তারা পরবর্তী সংলাপের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
বৈঠক শেষে এক্স (সাবেক টুইটার)-এ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি লিখেছেন, 'আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে।'
আলোচনা শেষ হওয়ার পরপরই সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, রোববার আবুধাবিতে পরবর্তী আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা দুই পক্ষের মধ্যে যথেষ্ট পারস্পরিক শ্রদ্ধা দেখতে পেয়েছি, কারণ তারা সত্যিই সমাধানের পথ খুঁজছিলেন।'
আলোচনা সম্পর্কে একজন কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা বিষদ এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনায় পৌঁছেছি এবং (আমরা মনে করি) ঈশ্বর চাইলে রোববার আরেকটি বৈঠক হবে যেখানে আমরা এই চুক্তিটিকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারবো।'
সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি (মুখোমুখি) আলোচনা হয়েছে—যা প্রায় চার বছরের পূর্ণ মাত্রার রুশ আক্রমণের ফলে সৃষ্ট এই যুদ্ধে অত্যন্ত বিরল। এছাড়া আলোচনাকারীরা ওয়াশিংটনের শান্তি কাঠামোর 'অমীমাংসিত বিষয়গুলো' নিয়ে কাজ করছেন।
আগামী সপ্তাহের আবুধাবি আলোচনার পরবর্তী ধাপ বিবেচনা করে, মার্কিন কর্মকর্তা মস্কো বা কিয়েভে আরও আলোচনার আশা ব্যক্ত করেছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'আমাদের মতে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, অথবা পুতিন, জেলেনস্কি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের আগে এই ধরণের আলোচনা হওয়া জরুরি। তবে আমার মনে হয় না যে আমরা সেই মুহূর্তটি থেকে খুব বেশি দূরে আছি।'
আলোচনার দ্বিতীয় দিনের ঠিক আগেই ইউক্রেনে ব্যাপক বোমাবর্ষণ
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে রাশিয়ার শত শত ড্রোন ও মিসাইল হামলার ঘটনাটি ইউক্রেনীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহাকে—যিনি আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন না—পুতিনের বিরুদ্ধে 'নিষ্ঠুর' বা 'কপট' আচরণের অভিযোগ তুলতে বাধ্য করেছে।
সিবিহা এক্স-এ লিখেছেন, এই বর্বর হামলা আবারও প্রমাণ করে য, পুতিনের স্থান (মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের) 'শান্তি বোর্ডে' নয়, বরং বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়। 'তার মিসাইলগুলো শুধু আমাদের মানুষকে আঘাত করেনি, বরং আলোচনার টেবিলকেও আঘাত করেছে।'
শনিবার ছিল এই আলোচনার নির্ধারিত শেষ দিন, যাকে জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আয়োজিত শান্তি প্রক্রিয়ার অধীনে প্রথম ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আলোচনাটি একটি 'গঠনমূলক ও ইতিবাচক পরিবেশে' পরিচালিত হয়েছে এবং এতে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক এই সংঘাত বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে এবং ছাড় দেওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিয়েভের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ বাড়ছে।
চলতি সপ্তাহে দাভোসে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে মার্কিন শান্তি দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, আলোচনায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং এখন কেবল একটি অমীমাংসিত বিষয় বাকি রয়েছে। তবে, রুশ কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে আরও বেশি সংশয় প্রকাশ করেছেন।
পুরো দনবাস চায় রাশিয়া
শনিবারের আলোচনার পর জেলেনস্কি বলেন, মার্কিন প্রতিনিধিদল 'যুদ্ধ শেষ করার শর্তাবলী নির্ধারণের সম্ভাব্য কাঠামো এবং এটি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি'র বিষয়টি উত্থাপন করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তার মতে, প্রস্তাবিত নিরাপত্তা প্রোটোকলগুলো 'অত্যন্ত শক্তিশালী' হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। তিনি বলেন, 'ইউক্রেনীয়রা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর অনেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এই নিরাপত্তা প্রোটোকলগুলো পর্যালোচনা করেছেন। নেটো প্রধান মার্ক রুটসহ প্রত্যেকেই একমত হয়েছেন যে, তারা এর আগে কখনও এত শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রোটোকল দেখেননি।'
তবে আলোচনার আগে শুক্রবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউক্রেনকে তার পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস—যা দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চল নিয়ে গঠিত শিল্পাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র—সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে রাশিয়ার জেদ থেকে তারা সরে আসেনি।
দোনেৎস্কের যে ২০ শতাংশ এলাকা—প্রায় পাঁচ হাজার বর্গ কিলোমিটার (এক হাজার ৯০০ বর্গ মাইল)—এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, পুতিন তা সমর্পণের দাবি তুলেছেন। এই দাবিটি যেকোনো চুক্তির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ দেশ দোনেৎস্ককে ইউক্রেনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও পুতিন দাবি করেন, দোনেৎস্ক রাশিয়ার 'ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের' অংশ।
চার বছরের দীর্ঘ ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রাশিয়া যে অঞ্চলগুলো দখল করতে পারেনি, জেলেনস্কি তা ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। জনমত জরিপগুলো বলছে, ইউক্রেনীয়দের মধ্যে কোনো ধরণের ভূখণ্ডগত ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নেই বললেই চলে।
রাশিয়া জানিয়েছে,তারা একটি কূটনৈতিক সমাধান চায়, তবে আলোচনা সফল না হওয়া পর্যন্ত সামরিক উপায়ে লক্ষ্য অর্জনের কাজ চালিয়ে যাবে।
ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব উমেরভ শুক্রবার গভীর রাতে জানান, প্রথম দিনের আলোচনায় যুদ্ধ শেষ করার মাপকাঠি এবং 'আলোচনা প্রক্রিয়ার পরবর্তী যুক্তি' নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যেই ইউক্রেন পুনরায় রাশিয়ার বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া রাতভর ৩৭৫টি ড্রোন এবং ২১টি মিসাইল দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় আবারও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যার ফলে রাজধানী কিয়েভের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ ও তাপহীন হয়ে পড়েছে। এতে অন্তত একজন নিহত এবং ৩০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।
শনিবারের এই বোমাবর্ষণের আগে নতুন বছর শুরু হওয়ার পর থেকে কিয়েভ ইতোমধ্যে আরও দুটি বড় হামলার শিকার হয়েছে, যার ফলে শত শত আবাসিক ভবনে বিদ্যুৎ ও হিটিং সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইউক্রেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী শনিবার জানান, সর্বশেষ রুশ হামলার পর কিয়েভে—যেখানে তাপমাত্রা ছিল প্রায় -১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস—৮ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন।
জেলেনস্কি শনিবার বলেছেন, রাশিয়ার রাতভর এই ভয়াবহ হামলা প্রমাণ করে যে চলতি সপ্তাহে দাভোসে ট্রাম্পের সাথে বিমান প্রতিরক্ষা সহায়তার বিষয়ে যে চুক্তিগুলো হয়েছে, তা 'পুরোপুরি বাস্তবায়ন' হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
