‘হুলো, হিলো, হোলা’: ‘হ্যালো’ শব্দের ৬০০ বছরের পুরোনো ইতিহাস
'হ্যালো' শব্দটি প্রথম ছাপার অক্ষরে ব্যবহার হয়েছিল ঠিক ২০০ বছর আগে। তবে এর শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ১৫ শতকেও। এই সম্ভাষণ কীভাবে বিশ্বজুড়ে বিবর্তিত হলো এবং আমাদের সম্পর্কে কী বলে, তা নিয়েই এই আলোচনা।
প্রতিদিন আমরা অজান্তেই অসংখ্যবার 'হ্যালো' বলি। ফোনে, ইমেইলে বা সামনাসামনি দেখা হলে। গানের কলিতেও মিশে আছে 'হ্যালো'। সিনেমার বিখ্যাত সংলাপেও এর ব্যবহার হয়েছে, যেমন 'জেরি ম্যাগুয়ার'-এর 'ইউ হ্যাড মি এট হ্যালো' বা 'স্কারফেস'-এর 'সে হ্যালো টু মাই লিটল ফ্রেন্ড'। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে অন্তর্বাস—সব কিছুর বিজ্ঞাপনেই এই শব্দ জায়গা করে নিয়েছে।
ছাপার অক্ষরে এই সর্বজনীন ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্ভাষণের ইতিহাস কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়। ১৮২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি কানেকটিকাটের 'দ্য নরউইচ কুরিয়ার' পত্রিকায় প্রথমবারের মতো 'হ্যালো' শব্দটি ব্যবহৃত হয় বলে ধারণা করা হয়। কলামের ভিড়ে লুকিয়ে থাকা সেই শব্দটিই আজ আধুনিক বিশ্বের সম্ভাষণের অন্যতম মাধ্যম।
১৮৫০-এর দশকে এটি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে পৌঁছায়। 'লন্ডন লিটারারি গেজেট'-এর মতো প্রকাশনায় জায়গা করে নেয় এবং ধীরে ধীরে ছাপার অক্ষরে পরিচিত হয়ে ওঠে। অন্য ভাষার সম্ভাষণের মতো 'হ্যালো'ও ইংরেজিভাষী বিশ্ব সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়। আমরা কোন ভঙ্গিতে বা উচ্চারণে এটি বলছি, তার ওপর নির্ভর করে এর অর্থ।
আঞ্চলিক টান বা অনলাইন যোগাযোগের সংক্ষিপ্ততার কারণে 'হ্যালো'র নানা রূপ দেখা যায়। কেউ যখন 'হে-ই-ই' (heyyy) বলে, তখন তা একটু ফ্লার্ট বা প্রেমের ইঙ্গিত হতে পারে। আবার 'হেলাউ' (hellaw) শুনে বোঝা যায় বক্তা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের, 'হাউডি' (howdy) হলে পশ্চিমাঞ্চলের। আর ছোট করে 'হাই' (hi) বললে বোঝা যায় বক্তা হয়তো ব্যস্ত বা রাশভারী।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ভাষাতাত্ত্বিক নৃতত্ত্বের অধ্যাপক আলেসান্দ্রো দুরান্তি বলেন, 'এটি বিভিন্নভাবে উচ্চারণ করা যায় এবং সামান্য সুরের হেরফের এর অর্থ বদলে দিতে পারে। যেমন, কেউ যদি শেষের স্বরবর্ণটি টেনে হ্যালো বলে, তবে এর মানে হতে পারে—হ্যালো, তুমি কি আমার কথা শুনছ? অথবা, হ্যালো, তুমি নিশ্চয়ই মজা করছ।' সুর ও আকারের মাধ্যমে এই সূক্ষ্ম অর্থ প্রকাশের ক্ষমতা নতুন কিছু নয়। এমনকি প্রথম ছাপার অক্ষরে আসার আগেও 'হ্যালো' ছিল বিভিন্ন ভাষার প্রভাব ও মিশ্রণের ফল।
'হ্যালো'র উৎপত্তি
ছাপার অক্ষরে আসার আগে 'হ্যালো'র উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক আছে। সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, এটি এসেছে প্রাচীন জার্মান শব্দ 'হালা' (halâ) থেকে। আগে মাঝিকে ডাকার জন্য এই শব্দটি ব্যবহার করা হতো। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি (ওইইডি) বলছে, শিকারি কুকুরকে জোরে দৌড়ানোর জন্য দেওয়া ডাক 'হালু' (halloo) থেকেও এটি আসতে পারে।
ওইইডি আরও কিছু পুরোনো বানানের কথা উল্লেখ করেছে। যেমন—'হুলো' (hullo), 'হিলো' (hillo) এবং 'হোলা' (holla)। ধারণা করা হয়, 'হোলা' শব্দটি এসেছে ১৫ শতকের ফরাসি শব্দ 'হোল' (hol) থেকে, যার অর্থ 'থামো' বা 'দাঁড়াও'। ইংরেজি সূত্রে ওইইডি ১৬ শতকের শেষের দিকের 'হলো' (hollo) শব্দটিকে আদিরূপ হিসেবে দেখিয়েছে। অক্সফোর্ডের ম্যাগডালেন কলেজের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক সাইমন হোরোবিন জানান, আঞ্চলিক উচ্চারণ ও বানানরীতির পার্থক্যের কারণে এমন পরিবর্তন হতে পারে।
তিনি বলেন, 'বিশেষ করে 'ইলো' (ello) উচ্চারণের ক্ষেত্রে, যেখানে 'এইচ' (h) বাদ দেওয়া হয়। এটি একসময় প্রচলিত থাকলেও এখন অশিক্ষিত বা নিচু শ্রেণির লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'আসল উৎস জানতে আমাদের লিখিত প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সব সময় পাওয়া যায় না। এটি এমন একটি কথ্য শব্দ যা লেখার চেয়ে মুখে অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। তাই সঠিক সময়রেখা বের করা কঠিন।'
হোরোবিন জানান, অভিধান প্রণেতারাই মূলত শব্দের একটি নির্দিষ্ট রূপ বেছে নেন। ১৮৮৪ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি যখন প্রথম ছাপা হয়, তখন 'হ্যালো' শব্দটিই প্রধান হয়ে ওঠে। যদিও চার্লস ডিকেন্স ১৯ শতকজুড়ে 'হুলো' (hullo) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ফোনের সম্ভাষণ হিসেবে 'আহয়' (ahoy) শব্দটি চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি 'হালু' (halloo) ব্যবহার করতেন। তবে বেলের প্রতিদ্বন্দ্বী টমাস এডিসন 'হ্যালো'র পক্ষে ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, খারাপ ফোন লাইনেও এই শব্দটি পরিষ্কার শোনা যাবে। এডিসনের সমর্থনের কারণেই 'হ্যালো' ইংরেজি ভাষায় সম্ভাষণের রাজা হয়ে ওঠে।
বিশ্বজুড়ে হ্যালো
ইংরেজি ভাষায় 'হ্যালো' স্থায়ী হলেও অন্যান্য ভাষা নিজস্ব সম্ভাষণ তৈরি করেছে। কিছু ইংরেজির প্রভাবে, আবার কিছু স্বাধীনভাবে। জার্মান ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাষায় 'হ্যালো' (hallo) এবং 'হালো' (hallå) শুনতে বেশ শক্ত ও কাজের কথার মতো মনে হয়। অন্যদিকে রোমান্স ভাষায় 'ওলা' (hola বা olá) অনেক বেশি সুরেলা ও কাব্যিক।
কিছু সম্ভাষণে জাতীয় ইতিহাসের ছাপও থাকে। যেমন আফ্রিকান্স ভাষায় ডাচ থেকে আসা 'হ্যালো' বা তিমুর-লেস্তেতে পর্তুগিজ প্রভাবের স্মারক 'ওলা'। অনেক শব্দই পরিচয় ও সম্ভাষণ—উভয় কাজ করে। তবে অধ্যাপক দুরান্তি বলেন, বিষয়টা এত সহজ নয়।
তিনি বলেন, 'কোনো নির্দিষ্ট সম্ভাষণ দেখে একটি জাতির চরিত্র বিচার করা লোভনীয় হলেও তা কঠিন।' বরং বিকল্প সম্ভাষণগুলো আরও ভালো সূত্র দিতে পারে। যেমন ইংরেজিতে 'হাউ আর ইউ?' (কেমন আছ?) বলে কুশল জানার রীতি আছে। পলিনেশিয়ান সমাজে হ্যালোর চেয়ে 'কোথায় যাচ্ছ?' বলে খোঁজ নেওয়ার প্রচলন বেশি। গ্রিসে 'ইয়াসু' বলে সম্ভাষণ জানানো হয়, যার অর্থ 'সুস্থ থাকো'। এটি বিদায় জানানোর সময়ও ব্যবহার করা হয়।
ইতালীয় ভাষায় 'চাও' শব্দটি ভেনিসীয় উপভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ 'আপনার সেবায়'। ফরাসি 'স্যালু' দেখা ও বিদায়—দুই সময়েই চলে। একইভাবে হাওয়াইয়ের 'আলোহা' ভালোবাসা বা মমতা এবং হিব্রুর 'শ্যালোম' শান্তি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তবে দুরান্তি সতর্ক করে বলেন, এগুলোকে জাতীয় চরিত্রের মাপকাঠি ভাবা ঠিক নয়।
তিনি বলেন, 'সম্ভাষণের একটি দিক সামাজিক কাঠামোর প্রতি সংবেদনশীল। সমমর্যাদার মানুষরা একে অপরকে যেভাবে সম্ভাষণ জানায়, ভিন্ন মর্যাদার মানুষের ক্ষেত্রে তা আলাদা হয়। আসলে সম্ভাষণ ঘনিষ্ঠতা বা সামাজিক দূরত্বের স্তর নির্ধারণ করে।'
ডিজিটাল যুগে হ্যালো
প্রযুক্তি আমাদের সম্ভাষণের ধরণ নীরবে বদলে দিয়েছে। ইমেইল, টেক্সট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা শুধু কতবার 'হ্যালো' বলছি তা-ই নয়, বরং এর পরিবর্তে কী ব্যবহার করছি—তাও বদলে গেছে।
ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার ভাষাতত্ত্বের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ক্রিশ্চিয়ান ইলবারি বলেন, 'হোয়াটসঅ্যাপের কথা ভাবুন। আমরা সারাক্ষণই অনলাইনে থাকি। কেউ যখন জিজ্ঞেস করে দিন কেমন কাটছে, তখন সব সময় আগে হ্যালো বলতে হয় না। কারণ আগের বার্তাটি হয়তো বিদায় দিয়ে শেষ হয়নি।'
ছাপার অক্ষরে আসার দুই শতাব্দী পর, সম্ভাষণ আবারও লম্বা, ছোট বা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। টেক্সট-নির্ভর এই যুগে এর বিবর্তন দ্রুত ঘটছে। ইলবারি ডিজিটাল ভাষায় 'হ্যালুউউ' বা 'হাইইই'-এর মতো অনেক বৈচিত্র্য দেখেছেন। তবে প্রযুক্তি শব্দ লম্বা করার সুযোগ দিলেও আধুনিক সম্ভাষণগুলো মূলত ছোট ও চটজলদি।
ইলবারি বলেন, 'এখন মানুষ হ্যালোর বদলে অনেক সময় শুধু হাত নাড়ানোর ইমোজি পাঠায়। প্রযুক্তি সব সময়ই ভাষার পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। আমরা এখন গুগল করি, আনফ্রেন্ড করি। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও আমাদের নতুন শব্দভান্ডার দেবে।'
১৯ শতকের শুরুর দিকে হ্যালো যেমন অস্থির ছিল, এখনো অনেকটা তেমনই। তখনো উচ্চারণে মিল থাকলেও বানানে ভিন্নতা ছিল। প্রতিষ্ঠিত সম্ভাষণকে ছোট করে বা আইকন দিয়ে প্রতিস্থাপন করে বোঝা যাচ্ছে যে, ১৮২৬ সালে 'দ্য নরউইচ কুরিয়ার'-এ ছাপার আগেও এটি যেমন পরিবর্তনশীল ছিল, এখনো তেমনই আছে।
তথাকথিত প্রমিতকরণ বা স্ট্যান্ডারডাইজেশন সত্ত্বেও 'হ্যালো' কখনো স্থির থাকেনি। এটি শুরু হয়েছিল চিৎকার বা ডাকার মাধ্যম হিসেবে। পরে একটি নির্দিষ্ট বানান ও ব্যবহারে স্থির হয়। দুই শতাব্দী পর এটি আবারও নতুন রূপ পাচ্ছে। তবে মুখে বলা হোক, টাইপ করা হোক বা স্ক্রিনে হাত নাড়ানোর ইমোজি হোক—এর পেছনের উদ্দেশ্য একই: নিজের উপস্থিতি জানানো এবং বিনিময়ে একটু স্বীকৃতি বা সাড়া পাওয়া।
