যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা: উদ্বেগ-উত্তেজনার সম্পর্কের ২৬ বছর
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের খবরে দুই দেশের সম্পর্ক এখন চরম তলানিতে। উত্তেজনা পৌঁছেছে চরমে।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার 'কার্টেল দে লস সোলস'-কে বিদেশি 'সন্ত্রাসী' সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। ওয়াশিংটনের দাবি, এর নেতৃত্বে আছেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি তারা। ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ মূলত দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের বোঝাতে এই নামটি ব্যবহার করেন। এটি আসলে কোনো সংগঠিত কার্টেল বা অপরাধী চক্র নয়।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) ভেনেজুয়েলার আকাশসীমাকে 'সম্ভাব্য বিপজ্জনক' হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই সতর্কতার পর বেশ কয়েকটি বিমান সংস্থা ভেনেজুয়েলায় ফ্লাইট বাতিল করেছে।
মাদকবিরোধী অভিযানের নামে গত কয়েক মাস ধরে ক্যারিবীয় সাগরে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ড্যান কেইন ক্যারিবীয় অঞ্চল সফর করছেন।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযান চালানোর জন্য সিআইএকে অনুমতি দেন। এতে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পুরোনো ইতিহাস আবারও সামনে আসে।
ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে তা হবে বড় ধরনের উসকানি। ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র মাসব্যাপী অভিযান চালাচ্ছে। মাদক পাচারের অভিযোগে বিভিন্ন নৌকায় চালানো হামলায় ইতোমধ্যে ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সোমবার ভেনেজুয়েলা সরকার কথিত মাদক কার্টেলকে 'সন্ত্রাসী' তকমা দেওয়াকে 'হাস্যকর মিথ্যা' বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলছে, ভেনেজুয়েলায় 'অবৈধ ও বেআইনি হস্তক্ষেপ' জায়েজ করতেই যুক্তরাষ্ট্র এই নাটক সাজায়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর আক্রমণ বাড়ান। তিনি তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের আলোচনার নীতি বাতিল করেন।
তবে ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে এই অবিশ্বাসের বীজ বোনা হয়েছিল আরও আগে। ১৯৯৯ সালে বামপন্থী নেতা হুগো শ্যাভেজ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। ২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি এবং ২৬ বছরের সংঘাতের সময়রেখা নিচে তুলে ধরা হলো:
- ১০ জানুয়ারি ২০২৫: বিতর্কিত নির্বাচনের পর তৃতীয় মেয়াদে শপথ নেন মাদুরো। যুক্তরাষ্ট্র একে জালিয়াতি বলে প্রত্যাখ্যান করে।
- জানুয়ারি ২০২৫: ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় ৬ লাখ ভেনেজুয়েলান নাগরিকের 'টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস' (টিপিএস) বাতিল করেন। ফলে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর পথ তৈরি হয়।
- ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫: ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার 'ট্রেন দে আরাগুয়া' গ্যাংকে 'বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে ঘোষণা করে। ট্রাম্প দাবি করেন এটি মাদুরোরই একটি শাখা, যদিও মার্কিন গোয়েন্দারা এর কোনো প্রমাণ পাননি।
- ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫: ট্রাম্পের গণহারে অভিবাসী ফেরত পাঠানোর উদ্যোগে সহযোগিতা করতে রাজি হয় কারাকাস। অভিবাসীদের প্রথম দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছায়।
- ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫: বাইডেনের দেওয়া ভেনেজুয়েলার তেল সুবিধা বা ছাড় বাতিল করেন ট্রাম্প।
- ২৪ মার্চ ২০২৫: যেসব দেশ ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনে, তাদের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প।
- ৮ আগস্ট ২০২৫: মাদুরোকে গ্রেপ্তারের জন্য পুরস্কারের অঙ্ক দ্বিগুণ করে ৫ কোটি ডলার করা হয়। তাকে 'কার্টেল দে লস সোলস'-এর 'বৈশ্বিক সন্ত্রাসী নেতা' আখ্যা দেওয়া হয়।
- সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০২৫: ২ সেপ্টেম্বর ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে 'মাদকবিরোধী' নৌ-অভিযান শুরু করে ওয়াশিংটন। কথিত 'মাদকবাহী নৌকা'য় অন্তত ২১টি হামলায় ৮৩ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
- ১৫ অক্টোবর ২০২৫: ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে তিনি ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযানের জন্য সিআইএকে অনুমতি দিয়েছেন।
- ২৮ অক্টোবর ২০২৫: মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতির কারণে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সঙ্গে গ্যাস চুক্তি স্থগিত করে ভেনেজুয়েলা।
- ১২ নভেম্বর ২০২৫: ভেনেজুয়েলা দেশজুড়ে সামরিক মহড়া শুরু করে।
- ১৪ নভেম্বর ২০২৫: দক্ষিণ আমেরিকার কাছে সেনা মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র 'সাউদার্ন স্পিয়ার' মিশন ঘোষণা করে।
- ১৪-১৬ নভেম্বর ২০২৫: যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী 'ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড', অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ, হাজার হাজার সৈন্য এবং এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান ক্যারিবীয় সাগরে মোতায়েন করে।
- ২২ নভেম্বর ২০২৫: এফএএ বিমান সংস্থাগুলোকে সতর্কবার্তা (নোটাম) জারি করে। এতে ভেনেজুয়েলার আকাশে জিপিএস বিভ্রাটসহ 'উচ্চমাত্রার সামরিক কার্যক্রমের' ঝুঁকির কথা বলা হয়। বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়।
পেছনের ইতিহাস: যেভাবে দূরত্বের শুরু
সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট শ্যাভেজের উত্থানের আগে কারাকাস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন কোম্পানিগুলো সেখানকার তেল খাতে বিনিয়োগ করে। ১৯২০-এর দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় বাজারে পরিণত হয়।
কিন্তু শ্যাভেজ তেল শিল্প জাতীয়করণ করেন। লাতিন আমেরিকায় মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তিনি। এতেই সম্পর্কে ফাটল ধরে। ২০০৭ সালে শ্যাভেজ মার্কিন তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসকে বের করে দেন। তবে আরেক মার্কিন কোম্পানি শেভরন তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
গত ২৫ বছরের সম্পর্কের খণ্ডচিত্র:
১৯৯৯ – শ্যাভেজের ক্ষমতা গ্রহণ: হুগো শ্যাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি 'বলিভারিয়ান বিপ্লব' শুরু করেন। সংবিধান পুনর্লিখন ও তেল খাত জাতীয়করণের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের পথ তৈরি হয়।
২০০০-এর দশক – শত্রুতা বৃদ্ধি: রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন শ্যাভেজ। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এনজিও ও কূটনীতিকদের বহিষ্কার করা হয়। উচ্চ তেলের দামে সামাজিক কর্মসূচির বিস্তার ঘটলেও অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি অর্থনীতিকে দুর্বল করতে থাকে।
২০০২ – অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা: একটি স্বল্পস্থায়ী অভ্যুত্থানে ৪৮ ঘণ্টার জন্য ক্ষমতাচ্যুত হন শ্যাভেজ। ভেনেজুয়েলা অভিযোগ করে, এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল। ওয়াশিংটন তা অস্বীকার করে। এই ঘটনাই পরবর্তী দুই দশকের অবিশ্বাসের ভিত্তি গড়ে দেয়।
২০১৩ – মাদুরোর উত্থান: শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তাঁর দীর্ঘদিনের সহচর মাদুরো নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে জয়ী হন। তাঁর সময়ে অর্থনীতির পতন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে।
২০১৪-১৫ – যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বড় নিষেধাজ্ঞা: মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ দেয়। এটি ছিল মোড় ঘোরানো ঘটনা। অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়। খাবার ও ওষুধের চরম ঘাটতি দেখা দেয়। আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি ও দেশ ছেড়ে মানুষের পলায়ন শুরু হয়।
২০১৭-১৯ – অর্থনৈতিক সংকট: যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে তাদের আর্থিক বাজার থেকে ব্লক করে দেয়। তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা কঠোর হয়। হাইপারইনফ্লেশন বা অতিমুদ্রাস্ফীতিতে অর্থনীতি ধসে পড়ে। ২০১৯ সালে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৩৪৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলে দাঁড়ায় ১৭২ শতাংশে।
২০১৮ – মাদুরোর বিতর্কিত পুনর্নির্বাচন: প্রধান বিরোধীদের নিষিদ্ধ করে নির্বাচন হয়। বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি দেয় এবং ভেনেজুয়েলার তেল, স্বর্ণ ও ব্যাংকিং খাতের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
২০২৪ – নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি: ছয় বছর পর মাদুরো আবারও বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হন। বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেসকে হারানোর দাবি করা হয়। তবে বুথফেরত ফলাফলে গঞ্জালেসের জয়ের ইঙ্গিত ছিল। জাতিসংঘ নির্বাচনের সমালোচনা করে। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেছিলেন, গঞ্জালেসের জয়ের 'অকাট্য প্রমাণ' আছে। ব্রাজিল, মেক্সিকোসহ লাতিন আমেরিকার বামপন্থী সরকারগুলোও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
