যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে 'আঞ্চলিক যুদ্ধ' শুরু হবে: খামেনির হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের কাছাকাছি তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে, তখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সতর্ক করে দিয়েছেন, তার দেশে যেকোনো হামলা একটি আঞ্চলিক সংঘাতের জন্ম দেবে।
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে খামেনি বলেন, 'আমেরিকানদের জানা উচিত যে তারা যদি যুদ্ধ শুরু করে, তবে এবার এটি একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হবে।'
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান বর্তমানে 'গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা' চালাচ্ছে এবং তিনি আশা করছেন, সেগুলো থেকে গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধান আসতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের কারণে ট্রাম্প এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, 'দুর্ভাগ্যবশত, আমরা আলোচনার অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারিয়েছি,' তবে তিনি আরও বলেন, অঞ্চলের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর মাধ্যমে বার্তার আদান-প্রদান ওয়াশিংটনের সাথে 'ফলপ্রসূ' আলোচনাকে সহজতর করছে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি এর আগে বলেছিলেন, আলোচনার একটি কাঠামো এগিয়ে চলছে।
সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে এই অঞ্চলে পাঠিয়েছে এবং গত সপ্তাহের শেষের দিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এটি আরব সাগরে অবস্থান করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
খামেনি আরও বলেন, '(ট্রাম্প) প্রায়ই বলেন যে তিনি জাহাজ নিয়ে এসেছেন... এসব জিনিসে ইরানি জাতি ভীত হবে না।'
রোববার ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এবং জ্বালানি সরবরাহের একটি প্রধান রুট—হরমুজ প্রণালিতে দুই দিনের সরাসরি গোলাবর্ষণসহ নৌ মহড়া শুরু করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে রোববার রয়টার্সের উদ্ধৃতিতে এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) নৌ শাখার এমন কোনো মহড়ার পরিকল্পনা নেই।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই জলপথটি সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার (২১ মাইল) প্রশস্ত। বিশ্বের বাণিজ্যিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। অতীতে ইরান হুমকি দিয়েছিল, দেশটির ওপর হামলা হলে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে নিজেদের বাহিনীর আশপাশে ইরানের কোনো 'অনিরাপদ ও অপেশাদার আচরণ' না করতে সতর্ক করেছে।
এর জবাবে আরাগচি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এখন আমাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী কীভাবে লক্ষ্যভেদ অনুশীলন করবে, তা নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করছে।'
শনিবার ইরানে দুটি বিস্ফোরণের ঘটনায় দেশটিতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, দক্ষিণের বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে একটি ভবনে বিস্ফোরণে একজন নিহত এবং ১৪ জন আহত হন। কর্তৃপক্ষের মতে, ওই বিস্ফোরণটি গ্যাস লিকের কারণে ঘটেছে।
বিস্ফোরণে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ শাখার একজন কমান্ডারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবিকে নাকচ করেছে আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম।
ইরানের দৈনিক তেহরান টাইমস-এর বরাতে বলা হয়েছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আহভাজে আরেকটি বিস্ফোরণে অন্তত চারজন নিহত হন। সেখানকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষও এই বিস্ফোরণের জন্য গ্যাস লিককে দায়ী করেছে।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ এড়াতে ইরানকে দুটি কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, 'প্রথমত, কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি নয়। দ্বিতীয়ত, বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে হবে।'
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে অস্থিরতা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ছয় হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার তথ্য তারা নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি আরও প্রায় ১৭ হাজার মৃত্যুর খবর যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে।
নরওয়েভিভিত্তিক আরেকটি সংগঠন, ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর), সতর্ক করে বলেছে—নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিক্ষোভকারীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো এমন প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন তারা আগে কখনও দেখেননি—এটি ছিল তাদের দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।
রোববার দেওয়া বক্তব্যে খামেনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা পুলিশ, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং ব্যাংক ও মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের উদ্ধৃতিতে তিনি বলেন, 'এই অভ্যুত্থান দমন করা হয়েছে।'
