যেভাবে এক বিলিয়নিয়ার বন্ধুর পরামর্শে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে উৎসাহী হন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদের একদিন হঠাৎ করেই শীর্ষ এক সহকারীকে ওভাল অফিসে ডেকে পাঠান নতুন একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা করতে। "ট্রাম্প আমাকে ওভাল অফিসে ডেকেছিলেন। "তিনি বলেছিলেন, এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছেন," ২০১৮ সালে ট্রাম্পের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে।
এটি ছিল একেবারেই অস্বাভাবিক একটি প্রস্তাব। আর এর পেছনে ছিলেন প্রেসিডেন্টের দীর্ঘদিনের এক বন্ধু, যিনি পরে ডেনমার্কের অধীন এই ভূখণ্ডে নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থ গড়ে তোলেন।
বোল্টনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যবসায়ী হচ্ছেন রোনাল্ড লডার। বিশ্বখ্যাত প্রসাধনী ব্র্যান্ড এসতি লডারের উত্তরাধিকারী এই ধনকুবের ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ট্রাম্পকে চেনেন—তারা দুজনই নিউইয়র্কের ধনাঢ্য সমাজের মানুষ।
বোল্টন জানান, তিনি (ট্রাম্প) গ্রিনল্যান্ড প্রস্তাবটি নিয়ে লডারের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। এই বিলিয়নিয়ারের হস্তক্ষেপের পর হোয়াইট হাউসের একটি দল ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন আর্কটিক অঞ্চলের বিশাল ভূখণ্ডটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ানোর উপায় খতিয়ে দেখতে শুরু করে।
বোল্টনের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে লডারের এই ধারণা নতুন করে অনুসরণ করা ট্রাম্পের শাসনশৈলীরই প্রতিফলন। "বন্ধুদের কাছ থেকে শোনা যেকোনো তথ্য তিনি সত্য বলে ধরে নেন, এবং সেই বিশ্বাস থেকে তাকে সরানো প্রায় অসম্ভব," বলেন বোল্টন।
এই প্রস্তাব ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষাকেও উসকে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আট বছর পর তিনি এখন শুধু গ্রিনল্যান্ড কেনার কথাই ভাবছেন না, বরং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও দখলের উপায়ও বিবেচনায় রাখছেন।
প্রেসিডেন্টের আশপাশের অনেকের মতোই লডারের নীতিগত প্রস্তাবগুলোয় তার ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলে মনে করা হয়। ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি বাড়াচ্ছেন, তখন লডার সেখানে বাণিজ্যিক সম্পদ অধিগ্রহণ করেছেন। ইউক্রেনের খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার পেতে আগ্রহী যে কনসোর্টিয়াম ট্রাম্পকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির সম্পদের অংশ দাবি করতে প্ররোচিত করেছে, লডারও তার একজন অংশীদার।
লডার জানিয়েছেন, ১৯৬০-এর দশকে একই নামজাদা বিজনেস স্কুলে পড়ার সময় ট্রাম্পের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পারিবারিক প্রসাধনী ব্যবসায় কাজ করার পর তিনি রোনাল্ড রেগানের আমলে পেন্টাগনে দায়িত্ব পালন করেন, পরে অস্ট্রিয়ায় রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং ১৯৮৯ সালে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে নির্বাচন করলেও তাতে জয় পাননি।
২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে লডার ট্রাম্প ভিক্টরি তহবিলে ১ লাখ ডলার অনুদান দেন। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের মানসিক স্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে লডার তাকে "অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষ" বলে সমর্থন জানান।
ওই বছরই লডার বলেন, তিনি ট্রাম্পকে "সবচেয়ে জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর" কিছু বিষয়ে সহায়তা করছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আর্কটিক অঞ্চল সম্প্রসারণের ধারণাও ছিল বলে মনে করা হয়। পরের বছর প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডে আগ্রহ প্রকাশের খবর ফাঁস করে। ডেনমার্কের নেতারা এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। জবাবে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের একটি গ্রামের মাঝে কল্পিত সুউচ্চ সোনালি রঙা ট্রাম্প টাওয়ারের ছবি টুইট করে লেখেন: "আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, গ্রিনল্যান্ডে এটা করব না!"
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের মোহ যেমন টিকে গেছে, তেমনি লডারের আগ্রহও। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপটি সামরিকভাবে দখলের কথা প্রকাশ্যেই বললে লডার তার পক্ষে দাঁড়ান।
"গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের ধারণা কখনোই হাস্যকর ছিল না—এটি ছিল কৌশলগত," নিউইয়র্ক পোস্টে লেখেন লডার। তিনি যোগ করেন, "বরফ ও পাথরের নিচে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য বিরল খনিজের বিপুল ভাণ্ডার। বরফ গলতে থাকায় নতুন নৌপথ তৈরি হচ্ছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার মানচিত্র বদলে দিচ্ছে।"
গ্রিনল্যান্ডকে "পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রস্থল" আখ্যা দিয়ে লডার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত একটি "কৌশলগত অংশীদারিত্ব" গড়ে তোলা। তিনি আরও বলেন, "আমি বহু বছর ধরে গ্রিনল্যান্ডের ব্যবসায়ী ও সরকারি নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি সেখানে কৌশলগত বিনিয়োগ গড়ে তুলতে।"
২০১৮ সালে লডার ট্রাম্পের দৃষ্টি গ্রিনল্যান্ডের দিকে ফেরানোর পর থেকেই, যা প্রথম প্রকাশ পায় পিটার বেকার ও সুসান গ্লাসারের বই দ্য ডিভাইডার-এ, এই প্রসাধনী সাম্রাজ্যের মালিক আর্কটিক ভূখণ্ডটিতে নিজের অর্থ বিনিয়োগ করছেন।
ডেনমার্কের করপোরেট নথি অনুযায়ী, নিউইয়র্কের ঠিকানাভুক্ত ও অঘোষিত মালিকানার একটি কোম্পানি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গ্রিনল্যান্ডে বিনিয়োগ করেছে।
এই কোম্পানির একটি উদ্যোগ হলো বাফিন উপসাগরের একটি দ্বীপ থেকে প্রাকৃতিক ঝরনার পানি রপ্তানি, যা বিলাসপণ্য হিসেবে ধনী খদ্দেরদের জন্য বাজারজাত করা হচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে একটি ডেনিশ পত্রিকা লডারকে বিনিয়োগকারীদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করলে এতে যুক্ত এক গ্রিনল্যান্ডিক ব্যবসায়ী বলেন, "লডার ও তার সহ-নিবেশকারীদের বিলাসবহুল বাজার সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়া রয়েছে এবং এই বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার রয়েছে।"
এই বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীটি গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় হ্রদ থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে একটি অ্যালুমিনিয়াম স্মেল্টার বা গলনাগার চালুর পরিকল্পনাও করছে বলে জানা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যদি আগ্রাসন, ক্রয় বা কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তবে তা লডারের ব্যবসায়িক স্বার্থে কী প্রভাব ফেলবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ধরতে সেনা পাঠানোর পর ট্রাম্প যখন বলেন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড "ভীষণভাবে দরকার", তখন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, ন্যাটোর এক সদস্যের দ্বারা আরেক সদস্যের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ এই জোটকে ভেঙে দেবে।
কিন্তু, এমন সতর্কবার্তায় ট্রাম্প তাতে বিচলিত নন। "আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কিছু একটা করব," তিনি গত সপ্তাহে বলেন, "হয় ভালোভাবে, নয়তো একটু কঠিনভাবে।"
বুধবার হোয়াইট হাউস বৈঠকের পর ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লুকে রাসমুসেন বলেন, "আমরা আমেরিকার অবস্থান বদলাতে পারিনি। এটা স্পষ্ট যে প্রেসিডেন্ট গ্রিনল্যান্ড জয়ের ইচ্ছা পোষণ করেন।"
ইউক্রেনের খনিজ সম্পদ ব্যবহারের চুক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে লডারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে, বিশেষ করে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে স্বার্থের সংঘাত ও প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠদের আত্মসমৃদ্ধির অভিযোগ ঘিরে। ট্রাম্পের দুই বড় ছেলে ডন জুনিয়র ও এরিক ভিয়েতনাম থেকে জিব্রাল্টার পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে যেন অর্থ উপার্জনের অভিযানে নেমেছেন।
তারা দাবি করেন, তাদের ব্যবসা ও বাবার ক্ষমতার মধ্যে "বিশাল দেয়াল" রয়েছে। ট্রাম্পের মুখপাত্র বলেন, "প্রেসিডেন্ট বা তার পরিবার কখনো স্বার্থের সংঘাতে জড়ায়নি এবং ভবিষ্যতেও জড়াবে না।" তবে বিদেশি শাসকেরা ট্রাম্প পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে, আর অনেক সময় তাতে প্রেসিডেন্টের সদয় দৃষ্টিও পেয়েছে বলে মনে হয়েছে।
একসময় লডার অবশ্য তার পুরোনো এই বন্ধুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছিলেন।
২০২২ সালে, ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়, ট্রাম্প মার-এ-লাগো ক্লাবে উগ্র ডানপন্থী নিক ফুয়েন্তেসকে আমন্ত্রণ জানালে লডার—বিশ্ব ইহুদি কংগ্রেসের প্রধান—এর নিন্দাই করেন। "নিক ফুয়েন্তেস একজন উগ্র ইহুদিবিদ্বেষী ও হলোকাস্ট অস্বীকারকারী," তিনি বলেন। "তার সঙ্গে কারও সম্পর্ক থাকা কল্পনাতীত।"
কিন্তু ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফিরতেই লডার আর্থিক সহায়তা পুনরায় শুরু করেন। ২০২৫ সালের মার্চে তিনি ট্রাম্প আন্দোলনের তহবিল সংগ্রহকারী সংস্থা ম্যাগা ইনক-এ ৫০ লাখ ডলার দেন। পরের মাসে লডার নাকি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ নৈশভোজের অতিথিদের একজন ছিলেন। যেখানে প্রতিটি টিকিটের মূল্য ছিল ১০ লাখ ডলার, এই আয়োজন থেকে পাওয়া অর্থ ম্যাগা ইনক-এ দেয়া হয়।
এসব কিছু যখন ঘটছিল তার মধ্যেই লডারের ব্যবসায়িক স্বার্থ আবারও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সঙ্গে মিলে যেতে দেখা যায়।
২০২৩ সালের নভেম্বরের একটি ফাঁস হওয়া চিঠিতে, খনি কোম্পানি টেকমেটের প্রধান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে জানান, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির একটি লিথিয়াম ভাণ্ডার কাজে লাগাতে আগ্রহী কনসোর্টিয়ামের অংশীদার হচ্ছেন লডার।
লডার তখন বলেন, তিনি নিজে ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের খনিজ নিয়ে কথা বলেননি, তবে "বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের অংশীজনদের সঙ্গে বিষয়টি তুলেছেন।" প্রভাবশালী রিপাবলিকানরাও ইউক্রেনের বিপুল সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হন। ট্রাম্প হয়ে ওঠেন এর সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমর্থক।
লডারের ম্যাগা ইনক অনুদানের কয়েক সপ্তাহ পরই ওয়াশিংটন ও কিয়েভ যৌথভাবে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদ ব্যবহারের চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে ট্রাম্পের সমর্থন অনেকটা বজায় থাকে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার জন্য জেলেনস্কি কৃতজ্ঞ নন, হোয়াইট হাউসে ডেকে তাঁকে প্রকাশ্যেই এমন তিরস্কার করার পর। কূটনৈতিকভাবে নজিরবিহীন ওই অপমানের ঘটনা সরাসরি টেলিভিশনের সম্প্রচারে দেখে বিশ্ববাসী।
যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন খনিজ চুক্তির আওতায়, প্রথম দরপত্রই আহ্বান করা হয় লিথিয়ামের ওই মজুতটির জন্য। চলতি মাসে লডার-নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামটি সেটি জিতে নিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্বদানকারী টেকমেট এবং লডার—দুজনেই এনিয়ে গার্ডিয়ানের কাছে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। গ্রিনল্যান্ডে লডারের ব্যবসায়িক অংশীদার ও হোয়াইট হাউসও গার্ডিয়ানের যোগাযোগে সাড়া দেয়নি।
